আলোর সন্ধানে - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
কর্মব্যস্ত শহর কলকাতা । দিনের বেলা মানুষের আর গাড়ীর আওয়াজে কানপাতার অবস্থা থাকে না। অথচ সন্ধ্যার পরে শহরের রূপ বদলাতে থাকে। দিনের বেলার কর্মব্যস্ত শহর,সন্ধের পর থেকে হাস্যময়ী - লাস্যময়ী হয়ে ওঠে। যত রাত বাড়ে তত শহরের চঞ্চলতা বাড়ে। অথচ এর পাশাপাশি ,রয়েছে প্রান্তিক অঞ্চল , যার সাথে ঝলমলে শহরকে মেলান যায় না। ঠিক যেন প্রদীপের তলায় জমা অন্ধকার। এই প্রান্তিক অঞ্চলে কিছু নিম্নবিত্ত মানুষের বাস, যারা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছে দুঃখ নিংড়ে সুখকে লাভ করতে। এখানকার সবাই কাজ করে বাঁচার জন্য - পেট ভরে খাবার জন্য। তবু তার মধ্যে আবার স্বপ্ন দেখে লেখাপড়া শিখে ভাল চাকরির, তাই ওরা নাইট স্কুলে পড়তে যায়। এরাই আমার আজকের লেখার কুশীলব। এরা এত সাধারণ যে আলাদা করে এদের নাম দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না। ওরা তো ভাগ্য বদলের সিস্টেমের লড়াকু সৈনিক, যাদের আমি কুর্নিশ করি ,ওদের মনের জোর আর সংগ্রামী মানসিকতাকে শ্রদ্ধা করি। তাই ওরা আজ শুধুই একটি ছেলে ও একটি মেয়ে, যারা ওদের সংগ্রামী শ্রেনীর প্রতিনিধিত্ব করছে।
রোজকার মত ওরা দুজন 'নাইট স্কুল' ক্লাস শেষে অন্ধকার গলিটা ধরে বাড়ি ফিরছিলোl গত চার বছরের অভ্যাস। সামনের বস্তির ঘরগুলোতে টিমটিম আলো ম্রিয়মাণ।
ছেলেটি জানতো এটা শুধুই বন্ধুত্ব নয়, আরও কিছু। সে বলে ওঠে: "আমি চাই আমরা বাকি জীবনটা এভাবেই এই পথ ধরেই চলবো। আমি তোমায় বেশি কিছু হয়তো দিতে পারবো না..." তার কথা শেষ হওয়ার আগেই মেয়েটির গলার স্বর ভেসে আসে: "আমাদের বস্তি আর এই রাস্তাটা যবে থেকে দেখেছি অন্ধকারে ভরা। তুমি কি আমার জীবন শুধু একটু আলোয় ভরাতে পারো?" বাতাসে ঘোরপাক খেতে থাকা এই শব্দগুলোকে ছেড়ে মেয়েটি সেদিন চলে যায়। বাকরুদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকে ছেলেটি, একা। ওদের এত কষ্ট , এত যুদ্ধ সবই তো অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের জন্য।
পরের দিন মেয়েটি একাই ফিরছিলো। ছেলেটি সেদিন ক্লাসে আসেনি। সচারচর যা হয়না। তখনই গলিটার প্রায় শেষে ছেলেটিকে সে দেখতে পেলো। কাছে যেতেই ছেলেটি বলে উঠলো :"একটু দাড়াও। একবার চোখ বন্ধ করো"। মেয়েটি তাই করলো। সে অনুভব করলো যে ছেলেটি তার তালুতে নরম নড়তে থাকা কিছু রাখলো। "চোখ মেল তোমার "ভেসে এলো ছেলেটির স্বর...
চোখের পাতা খুলতেই দেখলো জোনাকিদের চমক... আলোয় ভরা তার দুই তালু! তারা মেয়েটিকে ঘিরে উড়তে থাকে আর কানে আসে ছেলেটির কথা: "তুমি আমার জীবনে আলো হও তবেই পারবো ভরতে তোমার জীবন আলোয় প্রিয়া"। উজ্জ্বল জোনাকির মতো মেয়েটির চোখের মনি আর শান্ত হাসির রেখা তাদের জীবনের বাকি গল্পটা লিখেছিলো!
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন