প্রবীণ নিবাস - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

নিস্তব্ধ রাত। দূরে রাতশেষের ঘন্টা বাজছে, চারপাশ এখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। কেবল ঘুমহীন চোখে জেগে আছেন দ্বৈপায়ন চৌধুরী, আজ তার কোন ভাবেই ঘুম আসবে না। বহুদিনের চেনা নিস্তব্ধ ঘরটাতে একা একা জেগে ভাবতে লাগলেন - এই ঘরটার কথা, এই বাড়িটার কথা, খোকা, বউমা, ছোট্ট নাতিটা-----। সব ছেড়ে চলে যেতে হবে, আজকের পর কখনো থাকা হবেনা এই বাড়িতে। তার আর মিনুর বহু স্মৃতি বিজড়িত  এই ঘরটাতে আজই তার শেষদিন।
দ্বৈপায়ন বাবু  পুরোনো দেয়াল আয়নায় নিজেকে দেখলেন  আজ বহুদিন পর— 

বড্ড বয়স্ক হয়ে গেছেন তিনি, শরীরটাতো অনেক ভেঙে গেছে বহু আগেই, মিনুর চলে যাওয়াতে তার শক্তসমর্থ মনটাও কখন যে দুর্বল হয়ে পড়েছে দ্বৈপায়ন বাবু জানতেও পারেননি। আয়নায় প্রতিফলিত ওই চেহারাকে তাই অতীতের ধনী, দাম্ভিক, দুর্দান্ত দ্বৈপায়ন চৌধুরীর অপচ্ছায়া বলে মনে হয়। সে চেহারা যেন হারিয়ে
ফেলেছেন,মানসিক অতৃপ্তিই হয়ত কারণ। 

দ্বৈপায়ন বাবু আপনমনে হাসলেন, ভালোই হল মিনু চলে গেছে, নইলে আজকের দিন দেখলে সে কিছুতেই সহ্য করতে পারত না।
শয্যাশায়ী হয়ে যাবার পরেও সে ছেলে- ছেলের বৌকে ডেকে কতবার বলেছে, বুড়ো বাপটাকে দেখিস খোকা, আমি তো চললাম। ও বৌমা তোমার শ্বশুরটাকে একটু দেখো- ভালো হবে তোমার।
শুধু তার চিন্তাতেই মিনুর প্রানটা যেন বেরোতে চাইছিল না। দ্বৈপায়ন বাবুকে বলতেন, ওগো শরীরের কষ্ট আর যে সহ্য হয়না, তবু যখন ভাবি তোমাকে দেখার কেউ থাকবেনা তখন মরতেও ভয় লাগে। ভাবতে ভাবতে চোখের দৃষ্টি চোখের জলে ঝাপসা হয়ে পড়ে।
দ্বৈপায়ন বাবু চোখের জল মুছে নিলেন। অবশ্য মুছে নেবার কোনো দরকার ছিলনা ঝরতে দিলেই হত, কেই-বা দেখবে কার কাছ থেকে দুঃখ লুকাবেন, এরা দুঃখ পাচ্ছে জেনেই আঘাত করতে ভালোবাসে।
উপরের ঘরে ছেলে আর তার বৌ ঘুমুচ্ছে, নিরুদ্বেগ শান্তির ঘুম। মিনুর চলে যাওয়ার পর বাপের প্রতি কর্তব্য আর যত্নে আস্তে আস্তে উদাসীনতা ভর করলো। ছেলের অফিস। বৌমার অফিস, ক্লাব এই করে করে তার খোঁজ খবর নেওয়ার ঘাটতি হতে লাগলো। এরপর যখন নাতিটা হল তখন তো বৌমা তার বাপের বাড়ি গিয়ে উঠলো ছেলেও মাঝে মধ্যে ওখানে কাটাতে লাগলো অসুস্থ বাপের দায়িত্ব বাড়ির কাজের লোকের উপর দিয়ে।
দ্বৈপায়ন চৌধুরী এমন কিছু অসমর্থ বা অশক্ত লোক নন। এককালে হাঁকডাকে যথেষ্ট প্রতাপ ছিল তার। এদের সাহায্য ছাড়াই হয়তো চলতে পারতেন। কিন্তু হঠাৎ শরীরটাই বিশ্বাসঘাতকতা করলো। চিরদিনের হাঁপানি তো কাবু করলোই দেখা দিলো আরো নানা উপসর্গ। এ এক আশ্চর্য সময় কাটছিলো এ বাড়িতে। ঘরভর্তি মানুষ লোকজন , ছেলে বৌ নাতি বেয়ান তাদের আত্মীয় অথচ তাকে দেখবার তার খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। এক গ্লাস জল চাইলেও যেন সবাই বিরক্ত হয়। কাজের লোকটিও আড়ালে গালি দেয়। সত্যিই তো তার পিছনে সময় নষ্ট করে কি পাবে ওরা?
এই তো সেদিন ছেলের বন্ধু ও বন্ধুর বৌ এলো তাকে দেখতে। তারাই বলল হঠাৎ ,বন্ধুর বৌটি একটি প্রবীণ নিবাস বানিয়েছে। সেখানে দ্বৈপায়ন বাবুর মতো অসমর্থ লোকেদের অনেক সুবিধা। বন্ধুটা বললো যাবেন নাকি কাকা সেখানে ? অনেক ভালো থাকবেন। আপনার বয়স এর লোকজন আছে। গল্প করলে কথাটথা বললে অনেক ভালো লাগবে। এখানে তো এই একা থাকা -
দ্বৈপায়ন বাবু উত্তর না দিয়ে ছেলে কে দেখছিলেন এক দৃষ্টিতে। তার ছেলে কোনো উত্তর দিতে পারছিলো না। অবশেষে তার বৌ - ই তাকে বাঁচিয়ে দিলো। বললো, হ্যাঁ , বাবা যাবেন নিশ্চয় যাবেন। নয়তো এখানে বাবার ও কষ্ট হচ্ছে আমাদের ও কষ্ট হচ্ছে। আমার ছোট বাচ্চা অফিস সামলে বাবাকে দেখবার সময় পাই না। কাজের লোক রাখলে ওরা তো সারাক্ষন ই এক্সট্রা চার্জ দাবি করে। বলে কিনা বুড়োর নোংরা ঘাটতে হয়।
তাহলে ব্যবস্থা করি আমরা ? কি বলিস ? বন্ধু এই কথা বলাতে ছেলে মাথা নেড়ে ছিল। তার দিকে তাকাতে পারেনি আর , ছেলের বৌ উপযাচক হয়ে বলে যাচ্ছিল, মন খারাপ করবেন না বাবা, দেখছেন তো আপনার ছেলের অবস্থা, আমার অবস্থা। জায়গা টা এমন কিছু দূর নয় আমরা রোজ যাবো আপনাকে দেখতে। কি বলেন বাবা ?
দ্বৈপায়ন বাবু ছেলের বৌ নয় ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, যা ভালো বোঝো তোমরা।
আহা ! মিনু যে কত ভরসা করতো ছেলের উপর ! দ্বৈপায়ন বাবু মনে মনে বললেন মিনু তুমি দুঃখ পেওনা।আজ মনে হচ্ছে তুমি আগে চলে যাওয়ায় ভালই হয়েছে। এ দৃশ্য তুমি দেখতে পারতে না।

হঠাৎ কি একটা পাখির আওয়াজে দ্বৈপায়ন বাবুর চিন্তা অতীত থেকে বাস্তবে নেমে এলো। চেয়ে দেখলেন , ভোর হয়ে এসেছে। পাখীরাও সব জেগে উঠেছে, নূতন  এক ভোর - আজ থেকে শুরু হবে চির একাকিত্বের যাত্রা। দ্বৈপায়ন বাবু বিষন্ন মনে ভোর দেখতে লাগলেন। যে ভোর শুধুই আপনজন হারানোর শূন্যতা মাখা - অসহায়তা ভরা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।