রৌদ্র ছায়া - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
সময়টা প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে, অপরাহ্ন বেলার রোদও উজ্জ্বলতা হারিয়েছে এবং উত্তাপ কমেছে।
ক্লান্ত মন শ্রান্ত দেহে আলিপুর সিভিল কোর্ট থেকে বেরিয়ে এলো দুজনে। রাজ বললো, ভালো থেকো। মিতা হালকা হেসে উল্টোদিকে হাঁটা দিল। দুজনে দুজনের অজান্তে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো বাস ধরতে। আজ শেষ হয়ে গেল ওদের বিবাহিত জীবন। এখন বেঁচে থাকা ওই দুধের শিশুটির সংস্পর্শে। ডিভোর্সের এই প্রাপ্তির জন্য মামলা লড়েছিল ও। রাজের বাড়ি থেকে বাচ্চা চুরির অভিযোগে পুলিশের কাছে কমপ্লেইনও করেছিল ওর বিরুদ্ধে। কিন্তু সব শেষে জিত হয় সত্যের।
এখন ওর একমাত্র লক্ষ্য কিভাবে সন্তানকে বড় করে তোলা যায়।
এভাবে লড়াই করতে করতে কেটে গেছে বছর দশেক। মিতা নিজের বেসরকারি চাকরিতে ভর করে গুছিয়ে নিয়েছে সবকিছু। এর মধ্যে একমাত্র ভরসার স্থল বাবা চলে গিয়েছেন না ফেরার দেশে। বাবা মারা যাওয়ার পর ছোট্ট ফ্ল্যাটে মা কে এনে রেখেছে । ছোট্ট দীপ এখন ক্লাস ফাইভে পড়ে। মা অনেকবার করে বলেছে আবার বিয়ে করতে, ছেলেটা ছোট থাকতে থাকতেই। কিন্তু আর ওই পথ মাড়াতে চায়নি ও। কিন্তু মাকে দমিয়ে রাখা ভারী মুস্কিল হচ্ছে ইদানিং। ওনার খালি এক চিন্তা আমার কিছু হয়ে গেলে, কী হবে?এখন মা বেশ ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে সরগর। কয়েক মাস আগে হঠাৎ মিতার ছবিসহ খুলেছে matrimony প্রোফাইল, দিয়েছিল মিতারই মোবাইল নম্বর। যেদিন প্রথম একটা ফোন এসেছিল, কি অপ্রস্তুতে না পড়েছিল সে। বাড়িতে এসে প্রচুর ঝেড়েছিলো মাকে। ও বোঝে মায়ের চিন্তাটা। প্রোফাইলে মায়ের নম্বরটা আপডেট করে দিয়েছিল, আর স্ট্যাটাস বদলে করে দিয়েছিল বিবাহ - বিচ্ছিন্না ও বছর এগারোর সন্তানের মা।
জীবনের আরো কিছু মাস কেটে গেছে এর মধ্যে। এতদিন কিছু কথা মাকে বলেনি ও। মনের মধ্যেই জমিয়ে রেখেছে - অনেক বাধা কাটিয়ে কিছুটা এগিয়েছে নিজের ভালো লাগার জন্য , কিন্তু এবার মাকে বলতে হবে প্রতাপের কথা টা। তখন মাঝে মধ্যেই মা কিছু ফটো এনে দেখাতো আর নতুন ফোনের বাক্যালাপ শোনাতো। বিভিন্ন ভাবে কাটিয়ে দিত ও। কিন্তু কিভাবে যে এই সম্পর্কটা এগোলো নিজেই অবাক হয়ে যায়। প্রতাপের ফোনটা এসেছিল মাস তিনেক আগে। প্রথমেই মিতার প্রোফাইল স্ট্যাটাস বদলের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিল। নম্বর বদলানোর আগে যে প্রথম ফোনটা এসেছিল মিতার কাছে, সেটা প্রতাপেরই ছিল। নিজে ডিভোর্সি বলে আর বিব্রত মিতার গলা শুনে রেখে দিয়েছিল ফোনটা। কিন্তু, প্রোফাইলটা আপডেট হতে আবার যোগাযোগ শুরু করে। সেই থেকেই দুজনের ভালোলাগার শুরু। নিজেদের ছোট ছোট ঘটনার মিল আরো কাছে আনছিল দুজনকে। কিন্তু সাক্ষাতের সম্ভাবনা নেই, কারণ প্রতাপ ইউএসএ তে আছে চাকরিসূত্রে। দিন কয়েক আগে ভিডিও কল শুরু করেছে ওরা। দীপকেও ভালোবেসে ফেলেছে প্রতাপ , আর এটাই আরো কাছে এনেছে দুজনকে। একদিন রাতে খাওয়া দাওয়ার পর দীপ ঘুমিয়ে পড়লে মাকে বলে সব ঘটনা। মা তো শুনে খুব খুশি, এখুনি কল করতে বলে। মিতা মুচকি হেসে বলে, হবু শাশুড়ি একটু সাজুগুজু না করেই জামাইকে দেখবে?
মা বলে, তুমি সাজো, আমাকে এতদিন না বলে রেখেছ। অগত্যা সেদিনই ভিডিও কল করে কথা হয় প্রতাপের সাথে। দেখে খুব খুশি হয় মা। কল শেষ হওয়ার পর মা মেয়েতে খুব কান্নাকাটি করে। এতদিনের জমানো দুঃখ প্রকাশ পায় আনন্দাশ্রুর মধ্যে দিয়ে।
আজ রবিবার সন্ধ্যা, আগের কথামত প্রতাপের মা বাবার সাথে ভিডিও কল হওয়ার কথা। ঠিক সময়েই কথা হয় দুই পরিবারের। দুই পরিবারই চায় যত তাড়াতাড়ি চার হাত এক হোক। প্রতাপ ব্যবস্থা করতে থাকে মিতার ভিসার যাতে দেশে গিয়ে একেবারে বিয়ে করে নিয়ে আসা যায়। বিয়ের প্রস্তুতি শুরু হতে থাকে, আর মিতার মন ঘুরে বেড়ায় প্রজাপতির ডানায় ভর করে এবং সঙ্গে রাজকে হারিয়ে দেবার একটা চাপা আনন্দ ।
একদিন, প্রতাপ ফোন করে জানতে চায়, ভিসার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে, কারণ মিতার নামে পুলিশ কেস ছিল। মিতা সেই আগের ঘটনার কথা জানায় প্রতাপকে সেই ডিভোর্সের সময়কার ওর শ্বশুরবাড়ির মিথ্যে কেসের কথা। এভাবে পুরনো দাগ যে আবার ফিরে আসবে, কে বা জানত। খুব কান্নাকাটি করে মিতা । প্রতাপ সান্ত্বনা দেয়, কিছু একটা ব্যবস্থা করবে সে। কিছুদিন পর জানায় ওদের অফিসের ইন্ডিয়া এজেন্ট সব রেডি করে দেবে , ওখানে গিয়ে ফি দিয়ে আর ফর্মালিটিগুলো পালন করলেই চলবে। নিশ্চিন্ত হয় দুই পরিবার।
অবশেষে হতে চলেছে প্রতীক্ষার অবসান - আজ আসবে প্রতাপ , এই প্রথম কাছ থেকে দেখা। আর তর সইছে না মিতার। ঠিক সময়ে এসে পড়ে সে। ইতিমধ্যে দীপের সাথেও ভালই আলাপ হয়ে গেছে ওর। দীপ ও আপন করে নিয়েছে ওকে। প্রচুর খেতে ভালোবাসে প্রতাপ , আর এতদিন যা যা ভালোলাগার কথা বলেছিল, সব হাজির করেছে ভাবী শাশুড়ি। খাওয়ার পর আর ওঠার ক্ষমতা নেই প্রতাপের । ঘুমানোর আগে গুডনাইট বলে শুতে চলে যায় দীপ ও তার দিম্মা। প্রতাপকে নিজের ঘরটা দিয়ে, সোফায় নিজের শোয়ার ব্যবস্থা করে মিতা । হঠাৎ পিছন থেকে প্রতাপ এসে বলে আমার গুডনাইট কিস টা দাও। মিতা ওকে দূরে ঠেলে দেয়, বলে এসব বিষয়ে আমি একটু ব্যাকডেটেড, সব পাবে বিয়ের পরই। তারপর ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দেয় প্রতাপকে ।
সকালে বেরিয়ে বেশ কিছু মার্কেটিং শেষ করে ওরা। আজ আর কালকের দিন টা ছুটি নিয়েছে মিতা । রাতে খাবার টেবিলে খেতে খেতে প্রতাপের ফোন টা আসে।
"হোয়াই ডোন্ট ইউ টেল মি বিফোর? হাউ ক্যান ইউ সে দিস নাউ? এনি আদার অল্টারনেটিভস?"
"আই উইল কল ইউ ইন ওয়ান হাওয়ার"।
ফোনটা রাখার পর প্রতাপ যেটা বললো, যেহেতু মিতার কেসটা শুধু কমপ্লেইন এই আটকে ছিল না, অ্যারেস্ট পর্যন্ত হয়েছিল, ভিসা অ্যাপ্লিকেশন এ ১৫ লাখের পার্সোনাল বন্ড জমা দিতে হবে।
প্রতাপ বললো, "মিতা , তোমার অ্যাকাউন্টে কত আছে এখন?"
চিন্তিত মুখে মিতা বলে, লাখ পাঁচেকের মত।
"আমার কার্ড থেকে ৩ লাখ মত পাবো, কিন্তু বাকি আরো ৭ লাখ। বাদ দাও, বরং আমি কাল পরশুর মধ্যে ফিরে গিয়ে বাকি ব্যবস্থা করে ফিরবো। আমাদের শুধু রেজিস্ট্রির দিন টা চেঞ্জ করতে হবে, তুমি সেটা একটু দেখে নিও।"
মিতার মা বলে, "বাবা যা গয়না আছে মিতার, লাখ চারের মত হবে। বাকি দুটো এফডি থেকে আরো দু লাখ মত পাবো।"
"তাহলেও একলাখ কম হচ্ছে, মিতা কোনো চিন্তা করোনা, আমি এক উইকে ফিরে আসবো।"
মিতা বলে, "তুমি আমায় যে এনগেজমেন্ট রিং দিয়েছিলে সেটাও লাখের মতই হবে না? কাল ই সব ব্যবস্থা করে ফেলো।"
"দেখো, ওটা আমার প্রথম গিফট, ওটা নিতে বলো না, দেখছি কি করা যায়।" প্রতাপ বললো।
"আমি তো তোমার কাছেই থাকছি, তুমি আবার ওখানে তৈরি করে দিও। বেশ দুবার পাওয়া যাবে এনগেজমেন্ট রিং।"
পরদিন সারাদিন প্রতাপ গয়নার ব্যবস্থা করতে যায়, আর মিতা মাকে নিয়ে এফডি বন্ধ করে টাকার ব্যবস্থা করে। তুলে আনে নিজের ৫ লাখ ও। প্রতাপ ওর কার্ড থেকে তুলে আনে ৩ লাখ। শুধু কাল গয়নার ৪ লাখ পেলেই মিতাকে নিয়ে গিয়ে আলাদা বন্ড তৈরি করিয়ে আনবে প্রতাপ ।
পরদিন মিতা প্রতাপের অপেক্ষায় আছে, কিন্ত প্রতাপের দেখা নেই,অনেকবার ফোন করেও পাওয়া যাচ্ছেনা ওকে। এবার টেনশন হচ্ছে মিতার। অনেক্ষন বেরিয়েছে, কিছু বিপদ আপদ হলনা তো? কোনো অ্যাকসিডেন্ট হলনা তো? বেশ কিছুক্ষণ পর একবার ছুটে ভিতরের ঘরে যায় মিতা । ঘরে প্রতাপের কোনো লাগেজ পায়না সে। টাকার ব্যাগটাও নেই। ল্যাপটপ খুলে মাট্রিমনিয়াল সাইটে প্রোফাইল টা খুঁজে পায়না সে। এফবি প্রোফাইলেও নেই।
হতাশ হয়ে বসে পড়লো মিতা । সমস্ত ব্যাপার জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় ওর কাছে। বুঝে যায় আবার একটা নুতন যুদ্ধ শুরু করতে হবে সব বাঁচানোর আশায়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন