একটা সাধারণ প্রেমের গল্প - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
সারাদিন স্বামীর সাথে খুব একটা কথা বলার সুযোগ হয়না রমলার - কারন স্বামীর অফিস আর তাতে তার কর্মব্যস্ততা প্রচুর। কাজের চাপে দম ফেলতে পারেনা, এরকম পরিস্থিতি।
কিন্তু অফিস শেষে বাড়ি ফেরার সময় তার স্বামী তাকে রোজই একবার কল করবে অফিস থেকে বেরিয়ে ।এমনই এক মেঘাচ্ছন্ন সন্ধ্যা বেলায় রমেন তার রমলাকে কল করলো। অভিমানে মুখ ভারী করা বউ কল রিসিভ করেই বললো,
-- আমার খোঁজ-খবর তো আর আপনার রাখতে হবেনা।সারাদিন একা বাড়িতে কি করি না করি তাতো আপনি বুঝবেন না।থাকুন আপনি আপনার অফিস নিয়ে।
এই কথা গুলো রমলা তার স্বামী রমেনকে প্রতিদিনই শোনায়। সব অভিমান শুনে ক্লান্ত স্বামী হেসে উত্তর দিলো,
-- রাগ করো না সোনা ।এইতো এখনি বাড়ি ফিরবো।
-- আচ্ছা।আমার জন্য কি নিয়ে আসবেন?
-- সারা দিনের পরিশ্রমের ঝড়ানো শরীরের ঘাম আর এক পকেট ভালোবাসা।
খুনসুটির আলাপ শেষে বাড়ির রান্না করার জন্য টুকটাক জিনিসপত্রের নাম বললো।শেষে রমেনকে সাবধানে বাড়ি ফেরার কথা বলে কল কাটলো।
অনেক মেঘ আকাশে,বৃষ্টি আসবে কিছুক্ষনের মধ্যেই। আদিকাল থেকেই বৃষ্টির সাথে আমাদের প্রেম- বিরহের সম্পর্ক। বৃষ্টি আমাদের আবেগকে আপ্লুত করে। তাই বৃষ্টির দিন প্রেম-বিরহ-ভালবাসার দিন।অঝোর ধারার বৃষ্টি যেন প্রেমিকের হৃদয়ে বিরহের ধারা বহন করে। বৃষ্টিকালে সংবেদনশীল মানুষ রসসিক্ত হয়ে উঠে।তখন তার মনে পড়ে যায় সুখ অথবা দু:খময় অতীত।
গ্রীষ্মের তাপদাহে প্রকৃতি যখন অস্থির হয়ে ওঠে। যখন খাঁ খাঁ রোদ্দুরে পোড়া থাকে মাঠ-ঘাট, গরমে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ ,তলা শুকনো জলাশয়। যখন তৃষ্ণার্থ চাতকের বৃষ্টির জন্য করুণ আকুতি।তখনই বৃষ্টি বিরহের বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসে।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। তখন বৃষ্টির ফোঁটার একে অপরের মধ্যে বিলীন হওয়াতেই বৃষ্টির সার্থকতা। রিমঝিম শব্দে যখন বৃষ্টি পড়ে তখন গীতল সুরে শোনা যায় বৃষ্টির অর্কেস্ট্রা। বৃষ্টি মানেই মিলনের শঙ্খধ্বনি।
রমেন খিচুড়ির সাথে অমলেট খুব পছন্দ করে এই কথা রমলার মনে পরতেই রান্না ঘরে ঢুকে সব গুছিয়ে রান্না সেড়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখলো।তারপর নিজে একটু পরিপাটি হয়ে চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি রঙের লিপস্টিক দিয়ে চুল খোঁপা করে বারান্দায় বসে অপেক্ষা করে রমেনের বাড়ি ফিরে আসার।
কিছু সময় পর বাড়ির সামনে রিকশা থেকে রমেনকে নামতে দেখেই দৌড়ে নিচে চলে গেলো।রমেনের হাতের বাজারের ব্যাগটা নিয়ে একসাথে বারান্দায় আসলো।বৃষ্টিতে রমেনের শরীর খানিকটা ভিজে গেছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের জল মুছতে মুছতে রমলা বলে,
-- ছাতা তো আপনার সাথেই থাকে তাও ভিজে আসেন কেনো?
উত্তরে রমেন বলে,
-- না ভিজলে তো তোমার আঁচলের গন্ধ এখন শরীরে লাগাতে পারতাম না।
রমলা লজ্জা পেয়ে সরে যেতে চাইলে হাত চেপে ধরে রমেন বলে,
-- এখন একটু আমার পাশে বসো।সারাদিন তো বাড়ি থাকিনা এই নিয়ে তোমার অভিযোগের শেষ নেই। অথচ বাড়ি ফেরার পর,এখন যাচ্ছো কোথায়?
-- আপনার শার্ট ভিজে গেছে চেঞ্জ করুন তারপর অন্য কথা।যাই দেখি বাজারের ব্যাগে কি নিয়ে আসলেন।গুছিয়ে রেখে আসি।
-- না এখন যাবেনা,,,( এই বলে রমেন পকেট থেকে টিপের পাতা বের করে রমলার কপালে পরিয়ে দিয়ে বলে),,,গত দুইদিন তোমার কপালে টিপ দেখিনি। শেষ হয়ে গেলেও আমাকে বলোনা কেনো?
রমলা তখন মুচকি হেসে বলে,
-- আমার টিপ ছাড়া কপাল আপনার নজরে ঠিকই পরবে আর সময় করে নিয়ে আসবেন তাও জানি।সেজন্যই বলিনা। এবার হাত মুখ ধুয়ে তৈরী হয়ে নিন আমি টেবিলে খাবার রেডি করি।
-- আচ্ছা যাচ্ছি।
স্নান করে টেবিলে গিয়েই দেখলো আজকে খিচুড়ি আর অমলেট রান্না করে রাখা।রমেন তখন চেয়ারে বসে থাকা রমলাকে হাত ধরে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে বললো,
-- এতো ভালোবাসো কেন আমাকে?
-- আপনার চেয়ে বেশি তো বাসতে পারিনা।
-- না গো রমলা খুব কপাল করে তোমার মতো বউ পেয়েছি।সারাজীবন এভাবে বুকে আগলে রাখবো।
-- হয়েছে, হয়েছে ।চলুন খেয়ে নি এখন।
-- আসো রমলা আজকে আমি খাইয়ে দেবো তোমাকে।
রমলা খুশি হয়ে বলে ,,,
-- আচ্ছা তাহলে তো খুব ভালো হয়।
কথা বলতে বলতে দুজন খেয়ে নিলো। থালাবাসন পরিষ্কার করার সময়টুকুতে রমেন একটু ল্যাপটপ নিয়ে বসলো।সব কাজ শেষ করে রমলা রুমে এসে কপালের টিপটা আয়নাতে লাগিয়ে রাখলো।হাতের চুড়ি খুলে রাখতে রাখতে রমেনকে বলে
-- দেখুন বাইরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছে।
রমেন ল্যাপটপ সাইডে রেখে বলে,,
-- চলো বারান্দায় যাই।
বারান্দা দিয়ে দুজন একসাথে হাত বাড়িয়ে দিলো।রমেন হাতে বৃষ্টির জল নিয়ে রমলার মুখে ছুড়ে মারলে রমলার চোখ বন্ধ হয়ে আসে,বাতাসে চুল এলেমেলো হয়ে যায়।মুখের উপরের চুল গুলো ভেজা হাতে সরিয়ে দিয়ে রমলার কপালে চুমু খেয়ে বুকে জড়িয়ে রাখে।
-- চলো রমলা, রুমে গিয়ে শুয়ে পরি।
-- চলুন যাই।
বাইরে প্রচন্ড বাজ পরার শব্দে স্বামীর বুকে মুখ লুকিয়ে রাখা বউকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রমেন ।
-- জানো রমলা তোমাকে যখন বুকে জড়িয়ে রাখি সারাদিনের ক্লান্তি একটুও থাকেনা,,,
সকালে ঘুম ভাঙার পর রমলা কিছুক্ষণ আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে।তারপর কপালে চুমু খেয়ে সকালের জলখাবার বানাতে চলে যায়।
জানালার পর্দা সরাতেই রমেনের ঘুম ভেঙে গেলো।রমলা পাশে এসে বসতেই রমেন বুকে চেপে ধরে কপালে চুমু খেয়ে নিলো।
-- যান এখন স্নান করে নিন তারপর জলখাবার খাবেন। অফিসের সময় হয়ে গেলো সে খেয়াল নেই তো আপনার।
জলখাবার শেষ করে এখন রমেন অফিসের উদ্দেশ্য রওনা হবে।শার্টের বোতাম লাগিয়ে দেওয়ার সময় রমলা বলে,
-- তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসবেন।সাবধানে রাস্তা পার হবেন।আর দুপুরের খাবার ব্যাগে দেওয়া আছে সময় মতো খেয়ে নেবেন।
বউয়ের গালে হাত দিয়ে কপালে চুমু খেয়ে রমেন বেড়িয়ে গেলে আবার সেই বারান্দায় গিয়ে রমলা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে।দূর থেকে করা হাতের ইশারা আবছা হয়ে আকাশের গাড়ির সাথে ভীড়ের মাঝে হারিয়ে যায়। রমলা বারান্দায় কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে এসে নিজের কাজ করে।আর ভাবতে থাকে আজকে হয়তো বাড়ি ফেরার সময় রমেন তার জন্য গোলাপ ফুল নিয়ে ফিরবে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন