বিপন্ন বিশ্বাস - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
সংসারের থালা - বাসনের শব্দর সাথে প্রিয় পত্নীর আকাশ কাঁপানো বিলাপ দিয়ে প্রতিটি সকালের শুভারম্ভ হয়। দীর্ঘদিনের একই সম্প্রচার - কথাগুলো সব প্রায় মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। যদি এর সারাংশ নেওয়া হয়, তাতে প্রমাণিত যে অপদার্থ মানুষটার হাতে পড়ে জীবনে একটু শান্তি নেই - অথচ স্ত্রীর সফল ব্যবস্থাপনা ছিল বলে এ যাত্রা সংসার বেঁচে গেল। সুতরাং, অহেতুক তর্ক করা বোকামি।সেই রকম একটি সকালের শুরু হচ্ছিলো
অসীমের সংসারে। অসীমের স্ত্রী সীমা যেই বুঝতে পারলো যে অপরাধী জাগ্রত - ব্যস সম্প্রচারের তীব্রতা আরো বেড়ে গেল।
বলছি - আমার কথাগুলি কি তোমার কানে যাচ্ছে ? বলি , এই সংসারে যত কাজ , যত দায়িত্ব সবই কি আমার ? সকাল হতে হতেই রান্নাঘরে ঢুকে চা করা , সকালের জলখাবার তৈরি করা , ঘরদোর পরিষ্কার করা এরপর রান্নার যোগার করা । কতবার বলেছি - মেয়ে এবারে এম.এ. পাস করেছে , মেয়ে কিন্তু এখন বড় হয়েছে , এবার মেয়ের জন্য একটি সুপাত্রের খোঁজ কর । কার কথা কে শোনে ? সেটা ও আমাকেই খোঁজ করতে হবে !! কেন ? বাবা হিসেবে তোমার কি কোন দায়িত্ব নেই ? কোন চিন্তা-ভাবনা নেই ? সামনের বারান্দায় খবরের কাগজটা পড়তে পড়তে অসীম স্ত্রীর সব কথাই শুনতে পেয়েছে । তবু না শোনার ভান করে বললো -- সীমা , তুমি কি কিছু বলছো আমাকে ? তোমার কি চা করা হয়ে গেছে ? সীমা এই কথা শুনে আরো রেগে গিয়ে রান্নাঘরের থেকে ঝাঁঝালো গলায় বললো -- চা হয়ে গেছে , নিজে এসে নিয়ে যাও । বলি , কটা বাজে তোমার খেয়াল আছে ? ৮টা অনেকক্ষণ বেজে গেছে , এবার দয়া করে বাজারে যাও । এরপর বাজারে গেলে পচা মাছ আর পরে থাকা বাসী সবজিগুলি কিনে আনতে হবে । কাল রাতে তোমাকে পই পই করে বলে দিলাম , আজ বিকেলবেলা যারা আমাদের মেয়েকে দেখতে আসছেন , তাঁরা রাত্রিবেলা আমাদের বাড়িতে খেয়ে যাবেন । আমরা তাঁদের সেইভাবেই নিমন্ত্রণ করেছি । তাঁদের কি আমরা পচা মাছ খাওয়াবো ? অসীম বললো - আরে বাবা , এই যাচ্ছি বাজারে । রান্নাঘর থেকে সীমা বললো - সে তো আমি বুঝতেই পারছি .... । কখন তুমি বাজারে যাবে আর কখন আমি রান্না করব আর কখন যে ঘর-দোর পরিষ্কার করবো , তা শুধু ভগবানই জানেন !!
চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে অসীমের উদ্দেশ্যে বললো - আমি কত ভাল ভাল সম্বন্ধের খোঁজ নিয়ে এলাম , তুমি আর তোমার গুণধর মেয়ে মিলে কোন আমলই দিলে না । যতবার মেয়ের বিয়ের কথা তোমাকে বলি , ততবারই তুমি বলো - মেয়ে আমাদের আরও একটু বড় হোক । বলি , তোমার খেয়াল আছে এই বৈশাখে মেয়ে ২৩ পার করে ২৪শে পরবে । আর মেয়েটা ও হয়েছে তেমনি , বিয়ের কথা বললেই বলে - এখন নয় , আরো কয়েকদিন পর । আবার যুক্তি দেখায় - আমার বন্ধু জয়তির এখনো সম্বন্ধ দেখা শুরুই করে নি । সীমা আপন মনে গজগজ করতে করতে বললো - আরে বোকা মেয়ে , ভালো করে খবর নিয়ে দেখ , ওর বাবা-মা তলেতলে ঠিকই সুপাত্রের খোঁজ করে চলেছে । কোনদিন হঠাৎ করে শুনবি , জয়তির বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । আমার এই কথা তখন তুই মিলিয়ে নিস । কতবার বলেছি - জয়তির সঙ্গে অতো পীরিত করিস না । ও মেয়ে মহা চালু , তোকে এক হাটে কিনে আর এক হাটে বিক্রি করে দেবে । এবার বেশ চিৎকার করে অসীমকে বললো - আর বসে না থেকে দয়া করে বাজারে যাও । মেয়েটাও হয়েছে বাপের মত , এখনও পরে পরে ঘুমাচ্ছে । অন্তত আজকের দিনে মাকে একটু সাহায্য করবে , সেটা ওর চিন্তাতেই নেই । খুব ভাল করে জানে আজকে বাড়িতে লোকজন আসবে ।
সীমারেখা ঘুম চোখে উঠে বড় একটা হাই তুলে মাকে বললো - সকালবেলা থেকে এত চেঁচামেচি কেন করছ ? সীমা বললো - দ্যাখতো কটা বাজে ! , এত বেলা অবধি না ঘুমিয়ে আমাকে তো একটু সাহায্য করতে পারিস । তুই তো জানিস , আজ তোকে পাত্র পক্ষের লোকজন দেখতে আসছে । বেশ খানিকটা গদগদ হয়ে বললো - আমি বলাতেই তোর ফুলমাসী এই ভাল সম্বন্ধের খবরটা দিয়েছে । আমি মনে মনে যেমনটা চেয়েছিলাম , সম্বন্ধটা ঠিক সেইরকম । ছোট সংসার , বাবা , মা আর তাঁদের একটি মাত্র ছেলে । কলকাতায় নিজেদের বাড়ি , গাড়ি আর ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার । মোটা টাকার মাইনেতে কলকাতায় এক নামী তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানিতে কাজ করে । শুনছি , সামনেই নাকি বিদেশে যাবে । দেখিস , ওরা যখন তোকে দেখতে আসবে তখন আবার কোন বেচাল কথা বলিস না । ওদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করিস । ভাল করে ভেবে দেখতো , ভাল ভাল সম্বন্ধগুলিকে তুই না না অজুহাতে বাতিল করে দিয়েছিস । সীমারেখা এবার মজা করে বললো - তুমি আর একদম চিন্তা করো না । এবার ফুলমাসীর দেওয়া সম্বন্ধের সঙ্গে আমি বিয়ের পিঁড়িতে গিয়ে বসবো । আর একটা কথা , আমি জয়তিকে আসতে বলেছি সেইসময় । মা আবার রেগে গিয়ে বললো - কেন ? জয়তি আবার সেই সময় এসে কি করবে ? এইসব ব্যপারে বাইরের কোন বন্ধু-বান্ধবকে ডাকার কোন দরকার নেই । তাতে ফল ভাল হয় না । সীমারেখা হালকাভাবে বললো - জয়তি এসে আমাকে একটু মেক-আপ করে দেবে আর এছাড়া সেই সময় তোমাকেও একটু সাহায্য করবে । কথাগুলি সীমার একেবারেই মনঃপুত হলো না , মেয়েকে বললো - আমার কিন্তু তোর ঐ বন্ধুকে একেবারেই ভাল মনে হয় না । মুখে কোন কথা বলে না কিন্তু একেবারে এক নাম্বারের শয়তান । সীমারেখা বললো - তুমি মিছে মিছে ওকে দোষারোপ করছো , তুমি তো জানো ওই আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবী । সীমা এবার সস্নেহে সীমারেখাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললো - সত্যি সত্যি তোর বিয়েটা হয়ে গেলে ঘরটা আমাদের একেবারে শূন্য হয়ে যাবে ....।
সেদিনের সেই বহু প্রতীক্ষার সন্ধ্যেটা বেশ সুন্দর ভাবে কেটে গেল । পাত্রের বাবা , মা আর পাত্র নিজে সীমারেখাকে যে তাঁদের পছন্দ হয়েছে , সেটা তাঁরা জানিয়েও দিলেন । অসীম আর সীমারও ইচ্ছে এই পরিবারের সঙ্গে শুভ কাজটি করতে , বিশেষ করে এত ভাল পাত্র আর তাঁদের পরিবার । হাসি , হৈ-হুল্লোড়ের মধ্যে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হবার পর পাত্রের বাবা মা বললেন - দেখুন , আমরা যখন দুই পরিবার মিলে ঠিকই করেছি এই শুভ কাজটি করবার জন্য , তাই আমাদের মনে হয় ওরা বরং নিজেদের মধ্যে বসে একটু গল্পগুজব করে নিক । বুঝতেই পারছেন এখন দিনকাল সব পাল্টে গেছে । অসীম আর সীমা হাসতে হাসতে বললো - আপনারা ঠিকই বলেছেন । এখন তো আর আমাদের যুগ নয় , এখন হচ্ছে পরিবর্তনের যুগ । সীমা সীমারেখাকে বললো - তোরা বরং পাশের ঘরে গিয়ে কথাবার্তা বল , আমরা ওনাদের সঙ্গে কিছু দরকারি কথাবার্তা বলে নিই । সীমারেখা , জয়তি আর পাত্র নিজেদের মধ্যে হাসি , ঠাট্টার সাথে গল্পগুজব করার পর মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদান করল নিজেদের মধ্যে ।
পাত্রের বাবা মা বললেন - আজকের এই সন্ধ্যেটা আমাদের খুব ভালই কাটলো । হাসতে হাসতে বললেন - আমরা এবার আমাদের ঘরের লক্ষীকে পেয়ে গেলাম । এবার তবে আমরা উঠি । পাকা কথাতো আমাদের মধ্যে হয়েই গেল । আপনারা এর মধ্যে একদিন আমাদের বাড়িতে আসুন । আলোচনা করে বিয়ের তারিখটা ঠিক করে নেওয়া যাবে । পাত্রপক্ষ চলে যাবার পর , বাড়িটা ফাঁকা হতে সীমা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ভগবানকে স্মরণ করে বললো - যাক , এবার ভালোয় ভালোয় শুভ কাজটা যেন তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয়ে যায় ।
সপ্তাহ দুয়েক পার হয়ে গেল তবু পাত্রপক্ষের বাড়ি থেকে আর কোন যোগাযোগ নেই । সীমা অসীমকে বললো - কি হলো , বলতো ? ওদের এত আগ্রহ এই শুভ কাজ করবার জন্য , অথচ এখন তাঁরা একেবারেই চুপ । অসীম বললো - তুমি অযথাই টেনশান করছো । আরে , বিয়ে বলে কথা , ওঁদেরতো অনেক কাজকর্ম আছে , আর তাছাড়া ..., অসীমকে থামিয়ে সীমা চাপা স্বরে বললো - আমার কিন্তু একটু অন্যরকম লাগছে । আজকে সকালবেলা আমি নিজে ওনাদের বাড়িতে ফোন করেছিলাম । প্রথম কয়েকবার ফোনটাই ধরলেন না । তারপরে একবার ফোনটা ধরে আমাদের পরিচয় জানার পর এমন ব্যবহার করলেন যেন আমাদের চেনেনই না । অসীম বেশ চিন্তিত হয়ে একটু ভেবে বললো - তুমি বরং জয়তিকে জিগ্যেস করে দেখ ওর সঙ্গে পাত্রের ফোনে কোন কথা হয়েছে কিনা ? তুমি সেদিন বলেছিলে জয়তি তার মোবাইল নাম্বার পাত্রকে দিয়েছিল । সীমা বললো - ঠিকআছে , আমি সীমারেখার সঙ্গে কথা বলবো । হটাৎ দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ শুনে সীমা অসীমকে বললো - দেখতো এই ভর সন্ধ্যেবেলা আবার কে এলো ? অসীম দরজা খুলে দেখলো - জয়তির বাবা আর মা ।
জয়তির বাবা , মাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে । জয়তির বাবা ব্যাগের ভিতর থেকে বিয়ের কার্ডটা বের করে অসীমের হাতে দিয়ে বললেন - আপনাদের সকলের আশীর্বাদে জয়তির বিয়েটা হঠাৎ করেই ঠিক হয়ে গেল । পাত্রপক্ষ একেবারেই দেরি করতে চাইলেন না । পাত্র আবার বিয়ের পরেই জয়তিকে নিয়ে বিদেশে চলে যাবে । পরিবারটি খুব ভাল । বাবা , মা আর তাঁদের একটিমাত্র ছেলে । ছেলেটি ইঞ্জিনিয়ার । কলকাতায় তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানিতে মোটা মাইনেতে চাকরি করে । নিজেদের বাড়ি , গাড়ি - মানে খুবই সচ্ছল অবস্থা । সত্যি কথা বলতে ওরা নিজেরাই দেখে শুনে এই বিয়েটা করছে । খুব অল্প কয়েকদিন হলো ওদের মধ্যে আলাপ পরিচয় হয়েছে । আপনারা কিন্তু সবাই আগে আগেই যাবেন । সীমারেখাকে বিয়ের একদিন আগেই আমাদের বাড়িতে গিয়ে থাকতে হবে । সীমারেখা কোথায় ? সে বাড়িতে নেই ? সীমা বললো - ও একটু বেরিয়েছে , এখুনি এসে পরবে । আমরা তাহলে এবার উঠি । হাতে তো আর বিশেষ সময় নেই , এই অল্প সময়ে অনেক কাজ শেষ করতে হবে ।
অসীম , সীমা আর সীমারেখা ভাল করে বিয়ের কার্ডটি পড়ে বেশ অবাকই হোল । সীমা মনে মনে যে ব্যথিত , সেটা তার কথাতেই প্রকাশ পাচ্ছিল । ফুলমাসীর আনা সম্বন্ধের সঙ্গে জয়তির কি করে বিয়ে হচ্ছে !!! আর সবচেয়ে বড় কথা এই পাত্রপক্ষ তাদের বাড়িতে এসে সীমারেখাকে পছন্দ করে বিয়ের ব্যপারে একেবারে পাকা কথা দিয়ে গেলেন আর পাত্র নিজে জয়তিকে পছন্দ করে , কথাবার্তা বলে ফোন নাম্বার পর্যন্ত নিয়ে গেল । হঠাৎ এমন কি ঘটলো যে তাদের কোন খবর না দিয়ে একেবারে জয়তির সঙ্গে এই বিয়ে পাকা হয়ে গেল । কিন্তু কেন এমনটি হলো , তার প্রকৃত কারনটি কিছুতেই অসীম কিংবা সীমা বুঝে উঠতে পারছিল না । কেউ না বুঝুক , সীমারেখা অনুমান করতে পেরেছে প্রকৃত কারনটা । সেদিন পাত্রের সঙ্গে গল্পগুজব করার ফাঁকে , মোবাইল নাম্বার আদানপ্রদানের সময় জয়তি পাত্রের মোবাইল নাম্বারটা জানতে পারে । হয়ত জয়তি সীমারেখাকে কিছু না জানিয়ে পাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে , আর নিজের স্বার্থকে বড় করে দেখে এইরকম একটা ভাল ছেলেকে বাগিয়ে নিয়ে একেবারে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে চলেছে । হয়তো সীমারেখা ও তাদের পরিবার সম্বন্ধে বানিয়ে বানিয়ে অনেক মিথ্যে কথাও সে পাত্রকে বলেছে - সম্বন্ধ ভাঙার জন্য ।
এতদিনে সীমারেখা বুঝতে পারলো তার মার কথাগুলিই সত্যি হলো । মা তাকে বহুবার বলেছে - জয়তি মেয়েটা কিন্তু ভাল নয় , ওর সঙ্গে মেলামেশাটা তুই কম কর । বিশেষ করে পাত্রপক্ষ যে দিন তোকে দেখতে আসছে , সেদিন তুই ওকে বাড়িতে ডাকিস না । সীমারেখা মার কথা শোনে নি বরং জয়তিকে বিশ্বাস করে তার সমস্ত কথা জয়তির সঙ্গে শেয়ার করেছে এমনকি পাত্রপক্ষ তাদের বাড়িতে আসার দিন সরলমনে তাকে বাড়িতে আসতে বলেছে । কিন্তু এই বিশ্বাসের প্রতিদান জয়তি এমন ভাবে তাকে ফিরিয়ে দেবে সেটা সে স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে নি । একবার ভাবলো - মাকে বিয়ে ভেঙ্গে যাবার প্রকৃত কারনটা জানিয়ে দেবে , আবার ভাবলো মা হয়তো এতে কষ্ট পেয়ে চোখের জল ফেলবে । সারা বাড়িটায় খুশির আলোর রোশনাই আর সানাই এর সুরের বদলে গ্রাস করলো একরাশ হতাশার শূন্যতা , চরম এক নিস্তব্ধতা । সীমারেখা একান্তে চোখের জল মুছতে মুছতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জয়তির " সোনালি " কালিতে লেখা " শুভ বিবাহের " কার্ডটি দেখতে লাগলো ...।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন