বকাঙ্গনা মন - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী.
বহু দিন পড়ে কলকাতায় ফিরে গরমে নাজেহাল হিয়া, নিউ ইয়র্কের আবহাওয়ার সাথে আকাশ- পাতাল তফাৎ।কোলকাতা অসহ্য আবহাওয়ায়, গৃহ বন্দী মনটা যেন অতিষ্ট লাগছে, একটু খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসতে পারলে মনটা সজীব হত।
তাই সাহস করে মার কাছে বেরোনোর আর্জি পেশ করেই ফেলল।
"মা প্লিজ রাগ করো না। আজ একটু university - তে যাই।" হিয়ার আবদার।
মা হেসে বলল, "না বললে যেন শুনবি? যা ঘুরে আয়। যত্তসব পাগলামি।
আসলে university মানেই বই পাড়া। আর সত্যি বলতে কী নূতন বইয়ের টান আলাদা, একটা সুন্দর ভালো লাগা। কলেজে পড়ার সময় প্রায় দিনই আসা হত।
এখন প্রবাস জীবন - সেই সুদূর নিউ ইয়র্ক। জীবনে এখন প্রাচুর্য আছে, আছে বিজুর মত caring স্বামী, উইকেন্ডে বেড়ানো - এত কিছু পাবার পরও হিয়া বই পাড়াকে খুব মিস করে। বই পড়া যে ওর প্যাশন। বাধ্য হয়ে একই বই বার বার পড়ত, কী করবে? নিউ ইয়র্কে বাংলা গল্প উপন্যাস কোথায় পাবে ও?
বই পাড়ায় পৌঁছে, ওর চেনা দোকানে ঢুকলো। মনটা পুরো ভরে গেল - নূতন বইয়ের গন্ধ শুঁকতে কী যে ভালো লাগে। তাই বই ঘাটার ছলে বয়স, স্থান, কাল ভুলে বইয়ের গন্ধ শুঁকছে - বই ঘাটতে
ঘাটতে," কিছু বর্তমান নুতন লেখকের বই দেখান? " দোকানদার এতক্ষন হাঁ করে হিয়ার কার্যকলাপ দেখছিল, এখন কয়েকটা বই এনে সামনে রাখলো।
হিয়া নেড়েচেড়ে কখনো ভূমিকা বা কখনো রুদ্ধশ্বাসে দু - চার পাতা পড়ে ফেলছে।
বয়স কম হলেও ছেলেটির পাঠক চেনা জহুরীর চোখ - হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "এই বইটা নূতন লেখক প্রতীক গুহর লেখা। এ বছরের বেস্ট সেলার্স। আশা করছি আপনার ভালো লাগবে।
নামটা শুনে চমকে উঠলো হিয়া। পরক্ষনে মনে হলো - না, এই নাম তো কত লোকের আছে। আবার ভাবে, হতেও তো পারে, কলেজে থাকতে তো বেশ লিখতো। নূতন কিছু লিখেই বলত,"নূতন কিছু লিখলেই তোকে না দেখালে শান্তি পাই না।"
পড়া শেষ হলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো কৌতূহল ভরা চোখ নিয়ে। আমি বলতাম, " দারুন লিখেছিস প্রতীক। " তখন আমার প্রতীকের সব কিছুই দারুন লাগতো। ওর লেখা, ওর আঁকা, আবৃত্তি সব সব। ওর সাথেই তো প্রথম কলেজ স্ট্রিটের বই পাড়া চেনা। প্রতি বছর আমরা দুজনে বই মেলায় যেতাম। কত দিন বলেছি দেখিস প্রতীক একদিন বই মেলার ষ্টলে ষ্টলে তোর বই থাকবে। অথচ আজ দোকানে সারি সারি প্রতীকের বই। সাহিত্যিক প্রতীক গুহ। সে সব কবেকার কথা। আচ্ছা, আমি এসব ভাবছি কেন? এতো আমার প্রতীক নাও হতে পারে। নিজের অজান্তে 'আমার' প্রতীক, কথাটা বেরিয়ে এলো।
দোকানদারটি লজ্জিত ভাবে বলল, " আমি বইটা পড়েছি। যখন পড়বেন মনে হবে লেখক নিজের কথা লিখছেন। মনে হবে যেরকম শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন চরিত্রহীনে, অনেকটা সেরকম। নিজের কথা না হলে এই গভীর অনুভূতি আসে না।
অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম, "কতদূর পড়েছ?"
তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, " বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়তাম। হ্যাঁ, বইটা নিয়ে যা বলছিলাম, গল্পের প্রধান চরিত্র উত্তম সময় কাটায় তার প্রেয়সীর সঙ্গে যে কিনা থাকে বহুদূর বিদেশে, হয়ত কোনদিন আর দেখাই হবে না - সরি, দিদি আপনার সামনে কত ভুলভাল কথা বলে ফেললাম। তবে আপনি পড়লে দেখবেন এই কথাগুলো একেবারে সঠিক।"
হিয়ার মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল, এতো মিল!
গল্পের শেষ কয়েকটা লাইনে চোখ পড়তে চোখটা আটকে গেল।
উত্তম - " দূরে থাকতে পারবে তো রাধা? আমার বকাঙ্গনা মন হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে ঠিক তোমাকে ছুঁয়ে যায়। তোমার সাথে এ আমার প্রতি মুহূর্তের অনন্ত কালের ছোঁয়াছুয়ি খেলা। "
আপনমনে হিয়া উচ্চারণ করল রাধা! আরে এ তো আমি!
মনে পড়ে গেল - হঠাৎ এক সন্ধ্যায় এই নাম ধরে ডেকেছিল ওকে।
তখন হিয়া বলেছিলো, "এটা আবার কী নাম? আমার তো নিজের নামটা তো অনেক আধুনিক।"
"উত্তর!
কিসের?
তোমার প্রশ্নের। হিয়া তুমি বল না - আমরা কী শুধুই বন্ধু না আরো বেশী কিছু?
সত্যি সেদিন কি বা বলার ছিল? একটা সাহিত্য প্রেমী ছেলে, একটা বেকার পাগল ছেলে। শুধু দু - চোখ ভরে স্বপ্ন, লেখক হবার স্বপ্ন।
"স্বপ্ন আর বাস্তবের যুদ্ধে আমার এত সুন্দর নামটা মিথ্যে হয়ে যাবে। ভালোবাসার প্রতীক আমার আর হওয়া হলোনা। তুমি আমার কাছে আর এসো না রাধা।"
খুব কষ্ট পেয়েছিলাম! কত কেঁদেছিলাম!
কিন্তু ওর কিছু করার ছিল না। দু - চোখে ছিল স্বপ্ন। আর স্বপ্ন ছিল বলেই আজ এখানে।
এই দিনটার অপেক্ষায় এতগুলো বছর কেটে গেছে। সময় পেলেই বই পাড়া তোলপাড় করেছি শুধু একটি নামের খোঁজে। চলে গেছি বহুদূর। আজ আমি আছি, বই - পাড়া আছে আর পাশে প্রতীক থাকবে না। এ অসম্ভব।
মনের ভিতর ঝড়। নিজের অজান্তে কখন যে চোখের জল চিবুক বেয়ে ফোটা ফোটা শাড়িতে -
দোকানদার ছেলেটি এতক্ষন প্রচ্ছদের নারী মুখ দেখছিলো। চোখ তুলে বইটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, " দিদি, বইটা......। "
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললাম," হ্যাঁ দাও। কত দাম?
দোকানদার বলল, "দাম?" একটু ভেবে আবার বলল, "লাগবে না। বকাঙ্গনা মন তো শুধু আপনার জন্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন