সিক্ত বিহঙ্গ - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
বহুদিন প্রবাসে কাটানোর পরে দেশে ফেরার আনন্দর কোনো তুলনা হয় না। নানা স্মৃতি মনের মাঝে ঘুরে বেড়ায় আর চোখ বন্ধ অবস্থায় ছায়াছবির দৃশ্যর মত দৃশ্যমান হয় মনের ভিতর। হঠাৎ একটা তীব্র ঝাঁকুনিতে বাস্তবে ফিরে আসে।
সিঙ্গাপুর এয়ারওয়েজর বিমানটি মায়ানমারের উপর দিয়ে বাংলাদেশের আকাশ সীমায় প্রবেশের কয়েক মুহূর্ত পরেই পাইলট জরুরী ঘোষণায় সবাইকে সিট বেল্ট পড়তে বলল। আমি সামনের মনিটরে দেখছিলাম বিমান বেশ নিচুতে নেমে এসেছে। এক লাফে উনচল্লিশ হাজার ফিট থেকে বাইশ হাজার ফিটে। ভেবেছিলাম হয়ত বিমানটি অবতরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমার ভুল ভাঙল একটু পর। যত নিচে নামছি মনে হচ্ছিল ততই গাঢ় মেঘের ভিতর ঢুকে যাচ্ছি। ভয়ে সিটকিয়ে যাবার মত air turbulence আর সাথে বিদ্যুতের চমক। বুঝতে পেরেছিলাম কলকাতায় বৃষ্টি সাথে করেই নিয়ে এসেছি।
এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে উঠার আগেও বৃষ্টি শুরু হয়নি। তবে একটা ভ্যাপসা গরমের সাথে আকাশটাও খুব অন্ধকার। অনেকদিন এই আবহাওয়ার সাথে আমি পরিচিত না। গ্রাজুয়েশন শেষ করেই চলে গিয়েছিলাম উচ্চ শিক্ষার্থে দেশের বাহিরে। আর ফিরে আসা হয়নি। অনেক বছর পর এবার এসেছি একটা বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে । আয়োজক কমিটির প্রধান খুব কাছের বন্ধু। আমার অবশ্য অন্য একটা লোভও ছিল। অনেকবছর হয়ে গেল টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনি না। এই জুলাই মাসে বাংলায় টানা বৃষ্টি হয়। কিছুদিন আগে দক্ষিন কোরিয়ার ইকসান স্টেশন থেকে মোহেঙ্গা এক্সপ্রেসে সিউলে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টি শুরু হয়েছিল তখন। কিছু বৃষ্টির ঝাপটা ট্রেনের জানালায় এসে দুরের সব কিছু ঝাপসা করে দিচ্ছিল। যদিও কোরিয়ার বৃষ্টি আমাদের দেশের মত না। তবে পুরানো স্মৃতি মনে করিয়ে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। আমাদের দেশে বৃষ্টি মনে প্রেম বোধ জাগিয়ে তুলে। আর কোরিয়ায় এর মানে হল সব কিছু ধুসর অন্ধকার হয়ে থাকা। আর হেড লাইট জ্বালিয়ে একরাশ জল ছিটিয়ে দ্রুত গতিতে ছুটে চলা গাড়ির সারি। তবে ওখানে শীতকালের বৃষ্টি আনন্দময়। তখন প্রচন্ড ঠাণ্ডায় জলের ফোটা তুষারে পরিনত হয়। চারপাশে যতদুর চোখ যায়, রাস্তা, মাঠঘাট, গাছপালা, আকাশ সব সাদা তুষারের চাদরে ঢেকে যায়। শৈল্পিক ভঙ্গিমায় শ্বেত শুভ্র তুষারপাত অন্যরকম এক জগতের আবেশ তৈরি করে । ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে তখন।
ধর্মতলার বাস টার্মিনালে আসতে না আসতেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। আকাশের অবস্থা খারাপ এই জন্যেই কিনা টার্মিনালে প্রচণ্ড ভিড়। সবার ভিতর একটা তাড়াহুড়া ভাব। ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম। লোকে লোকারন্য অবস্থা তার উপর অনেকদিন পর দেশে এসেছি। কপাল নেহাত খারাপ বলব না, কলকাতা থেকে হলদিয়াগামী বেসরকারি বিলাস বহুল পরিবহনের টিকিট পাওয়া গেল। অবশ্য আরো তিন ঘন্টা পর।
‘এই যে নয়ন ভাই শুনছেন ?
পাশ থেকে মনে হল আমাকে কেউ কয়েকবার ডাক দিল। পরিচিত কন্ঠের ডাক। তাকিয়ে দেখি লিলি। এতদিন পর দেখা। দেখে চিনতে একটু সময় লাগল। তবে কন্ঠস্বর আগের মতই আছে। কতদিন পর দেখা তা ঠিক মনে করতে পারছিনা। খুব সম্ভবত পনের কি ষোল বছর তো হবেই। এই ক’বছরের ব্যবধানে ওর কত পরিবর্তন। এখন ওর নাকের উপর বসেছে কালো ফ্রেমের মোটা চশমা। চেহারা অনেক খানি বদলে গিয়েছে মাঝখানের সময়ের আবর্তে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। এতগুলি বছর পর যে চিনতে পেরেছি এটাই তো অনেক বেশি। লিলি যদিও আমার ছোট বেলা থেকেই পরিচিত। ছোট মফস্বল শহরে পাশাপাশি বাসায় থাকতাম। দিনে কতবার দেখা হত হিসেব করে বলা কঠিন। আমাদের এলাকায় সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে ছিল ও। শুধু সুন্দর বললে ভুল হবে। আমাদের যখন প্রেম হয় তখন আমার এইচ এস পরীক্ষা সামনে। টিনেজার হিসাবে যা হয়। প্রেমে পড়ার বয়স তাই পড়তেই হবে। আমাদের ক্ষেত্রে ওরকমই ছিল হয়ত।
চারপাশের হাঁকডাকে আমার হুঁশ ফিরল। এই যাহ, ও বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে! তাকিয়ে দেখি রাস্তায় জল জমা শুরু হয়েছে। লিলিকে দেখে কষ্টই লাগল। বেচারির শাড়ি কাদায় মাখামাখি। কোন রকম ভাবে বাস টার্মিনালের ভিতর ওর জন্য জায়গা ম্যানেজ করা গেল। বৃষ্টির কারনে এত ভিড় বেড়ে গিয়েছে, ঠিক মত পা ফেলার মত অবস্থা এখন আর নেই। কলকাতা শহরে বৃষ্টি আসে ভয়ংকর রূপ নিয়ে। গল্প কবিতায় হয়ত তা উপভোগ্য। বাস্তবে তা নয়। লিলির চেহারায় কি যেন একটা নেই। সম্ভবত আগের চঞ্চলতা। তার বদলে কেমন জানি একটা মায়া তার স্থান নিয়েছে। খোলা বইয়ের মত। ঠিক চোখে পড়ে ফেলা যায়। কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল মহাদেব সাহার কবিতাকে নিজের মত করে বানিয়ে বলি, এক কোটি বছর পর তোমার সাথে দেখা।
কিছুটা সময় লাগল ধাতস্ত হতে। লিলিও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ফেলেছে। বিপদের সময় আমাকে দেখে ভুলেই গিয়েছিল আজ এত বছর পর আমার নাম ধরে ডেকেছে।
‘তুমি কেমন আছ? কলকাতায় কি করছ? তুমি না মেদিনীপুরে থাক?
আমার এতগুলো প্রশ্ন শোনে ও একটা লাজুক হাসি দিল। এত বছর পর ওর সেই হাসির কথা মনে পড়ে গেল। কলেজে ছিলাম সময় আমরা একসাথে অংক প্রাইভেট পড়তে যেতাম জয়ন্ত স্যারের কাছে। কি একটা কৌতুক বলেছিলাম। আর ওর কি হাসি। জয়ন্ত স্যার রাগান্বিত ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। যেন আমিই সব কিছুর মূল। ওদিকে লিলির হাসি বন্ধ হবার কোন লক্ষন নেই। মিলি অতি ভালো ছাত্রী হবার কারনে সেদিন পার পেয়ে গেলেও আমার বাসায় নালিশ এল। এই রকম হেনস্থা করার কারনে কি রাগটাই না হয়েছিল ওর উপর সেদিন। অনেকদিন আর একসাথে জয়ন্ত স্যারের বাসার আশে পাশেও যাইনি।
‘নয়ন ভাই, আমাকে একটা বাসের টিকেট কেটে দিতে পারবেন? কলকাতায় এসেছিলাম কলেজের একটা কাজে। কাউন্টারের ভিড়ের যে অবস্থা।‘
অনেক কষ্টে বাসের টিকেট নিয়ে এসে লিলির হাতে দিলাম। ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও টিকেটের টাকা নিতেই হল। এ নিয়ে কোন সিন ক্রিয়েট হোক এই ইচ্ছা ছিলনা।
আরো দুটো বাসের পর লিলির বাস। তার মানে আরো দুঘণ্টা দেরী। ওকে দেখে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে। আমার মনে একটা অপরাধবোধ কাজ করলেও ইচ্ছা করেই কাজটি করেছি। কতদিন পর ওর সাথে দেখা। আবার চোখের পলকে হারিয়ে ফেলে অনুশোচনায় ভুগতে ইচ্ছে হলনা।
‘কোথায় যাচ্ছেন আপনি?
‘হলদিয়া। একটা কনফারেন্সে যোগ দেবার জন্য এসেছি।‘
খানিক সময় আমরা দুজনেই নিঃচুপ। আমিই শুরু করলাম আবার-
‘এই বৃষ্টিতে কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবে। চল, চা খাবে।‘
আমার ভিতর আর জড়তা ছিলনা। হয়ত অধিকার নিয়ে চায়ের আবদারটা বুঝতে পেরেছিল। না বুঝার কিছু ছিলনা অবশ্য। এমনিতেই মেয়েরা এসব অধিকারের ব্যাপারটা অল্পতেই ধরতে পারে। এমনকি ওরা কারোর চোখের দিকে না তাকিয়েই বলে দিতে পারে অনেক কিছু! লিলি একান্ত বাধ্য মেয়ের মত আমার পিছন পিছন আসছে। আমাদের প্রেমের প্রথম দিনগুলিতে চায়ের দোকানের আশে পাশেও যাইনি। একবার ওদের বাসায় গিয়েছিলাম। ও আমার জন্য চা বানিয়ে এনেছিল। মুখে দিয়ে মনে হল চা না খাওয়াই হয়ত ভালো ছিল। বেচারী চিনি এত বেশি দিয়েছিল যে এটা একপ্রকার শরবত হয়ে গিয়েছিল।
‘তুমি কি এখনো চায়ে চিনি বেশি খাও?’
আমার কথা শোনে লিলি একটু কেঁপে উঠল। কিছুই বলল না। আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি বুঝতে পেরে মোবাইল নিয়ে কি দেখতে লাগল। যেন কিছুই দেখছেনা বা শোনছেনা।
‘আপনি দেশে এলেন কবে?’
‘এই তো আজকেই এলাম।‘
‘আবার চলে যাবেন। না এবার পাকাপাকি ভাবে দেশে থেকে যাবেন?’
‘যাযাবর জীবন। এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরি। এই বেদুইন জীবন থেকে সরে আসতে পারব বলে মনে হয় না। সত্যি করে বলতে কি তেমন ইচ্ছাও আর নেই।‘
‘বিয়ে করেননি কেন, এখনো?’
লিলি অনেকটাই ধাতস্থ হয়ে গিয়েছে। ও এখন আগে যেভাবে কথা বলত সেভাবেই বলছে। কত অধিকার নিয়ে। মেয়েদের এই গুণটি দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। কত সহজেই কত মাস কত বছরের না দেখা সময় ভুলে গিয়েছে। আস্তে আস্তে ওর কিশোরী সুলভ উচ্ছলতাটাও ফিরে এসেছে।
‘তোমার মত কাউকে পাইনি বলে।‘
বলেই একটু উচ্চস্বরে হাসলাম। ভেবেছিলাম লিলি রাগ করে বসবে। না, ও রাগ করেনি। বরং মিটিমিটি করে হাসছে। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা। তবে ভেবে একটু অবাক লাগল। চরম একটা সত্যি কথা কত সহজেই যেন বলা হয়ে গেল।গলাটা একটুও কাঁপল না। প্রথমবার লিলিকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়াটা আজকের মত এত সহজে বলা হয়নি। কতদিন সাইকেলে করে ওর রিকশার পিছনে পিছনে ঘুরেছি। ও হয়ত বুঝতে পারত। কিন্তু কিছুই বলত না। মাঝে মাঝে কপট রাগ করে রিকশার পিছন ফিরে আমার দিকে তাকাত। মাসের পর মাস এভাবে ওর পিছনে ঘুরতে দেখেই কিনা আমার প্রেমে পরেছিল অবশেষে। মনে পরলে এখনো হাসি পায়। আষাঢ় মাসের ভারী বৃষ্টিতে সব যেন ভেসে যাচ্ছিল। আমি কাকভেজা হয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে সাইকেল নিয়ে ওর রিকশার পিছনে যাচ্ছি। পরেরদিন সকাল বেলা ওর গোটা গোটা হাতে লিখা চিঠি। সামনে আপনার পরীক্ষা। এভাবে ঘুরলে পরীক্ষা খারাপ হবে। আরো কত কি লিখা ছিল! ওটা চিঠি ছিল। হয়ত কথার কথা। আমি যা ধ্রুব সত্য বলে মেনে নিয়েছিলাম। চিঠিতে একটা শর্তের কথা লিখেছিল। তিনটি কদম্ফুল নিয়েই যেন ওর সামনে যাই। আপাত দৃষ্টিতে খুব সাধারন মনে হলেও আমার কদমফুল যোগার করতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে গিয়েছিল।
‘আপনার উপন্যাসের কি খবর, এখনো লিখেননি কেন? না ভুলেই গিয়েছেন?’
‘প্রথমে সময় পাইনি। আর যখন লিখব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম তখন দেখি গল্পের নায়িকা হারিয়ে গিয়েছে। এই সময়ে লিখতে বসলে নায়িকা না আবার খলনায়িকা হয়ে যায়। অবশ্য, আমি তো তোমার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় না। যার গল্পের নায়িকা হবে অতি অসাধারণ।‘
এই বলে আরেক দফা হাসলাম। তবে এই হাসি লোকদেখানো হাসি।
‘আপনি আগের মতই আছেন এখনো। সবকিছুতেই ফাজলামি করেন। সিরিয়াস হতে পারলেন না আর।‘
‘একমাত্র তোমার জন্যই কিন্তু সিরিয়াস ছিলাম।‘
লিলি তার সমস্ত সত্ত্বা জুড়ে ছিল লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নায়িকা। প্রথম প্রথম খুব রাগ হত। তারপরও কিছু বলিনি। তবে আমি পাড় সুনীল ভক্ত হয়েও লিলির সাথে যতদিন সম্পর্ক ছিল ততদিন কোন উপন্যাস পড়িনি। এটা কি প্রিয় লেখকের সাথে অভিমান না হিংসা। ঠিক বলতে পারবনা। ঠিক করেছিলাম একদিন আমিও উপন্যাস লেখা শুরু করে দেব। আমার কথা শুনে লিলির কি হাসি। অনেকটা কাটা গায়ে নুনের ছিটের মত।
মিটিমিটি হেসে জিজ্ঞাস করল-
‘বৃষ্টি তো আপনার খুব প্রিয় ছিল। এখনো ভিজতে ইচ্ছে হয়?’
‘নাহ, আমাদের দেশের মত এসব রোমান্টিক বৃষ্টি কোরিয়াতে হয় না।’
‘ওখানে কি কদমফুল ফোটে বৃষ্টিতে?’
‘ঠিক বলতে পারবনা। তবে আমার যান্ত্রিক নগর জীবনে বৃষ্টি, কদম ফুল এসব দেখিনি কখনো।‘
লিলি আমার কথাকে পাত্তা দিল না। সে নিজের মত করে বলেই চলল-
‘সোনিয়ার কথা মনে আছে?’
‘হ্যাঁ মনে আছে। ফেসবুকে ওর সাথে কথা হয়।‘
‘ওর কাছ থেকেই আপনার খোজ খবর নেই মাঝে মধ্যে ।‘
বেশ অবাক হবার মত। আমি ভেবেছিলাম এই আমিই শুধু খোঁজ খবর রাখি। ভেবেছিলাম ও ভুলে গিয়েছে সবকিছু। সংসার, শিক্ষকতা এইসব জাগতিক ব্যস্ততায়। এতদিন পরে এসে একটা প্রশ্নের উত্তর জানতে খুব ইচ্ছে হল। কেন সে সেদিন আমার হাতটা ধরতে পারেনি। ওদিকে লিলি বলেই চলল ওর কথা। আমার মাথায় ওসব কিছুই ঢুকছে না। আমি ভাবছি ওর সাথে শেষ দেখা হওয়া দিনটির কথা। আমার স্পষ্ট মনে আছে সবকিছু। ওর ফ্যামিলিতে কিছু ঝামেলা চলছিল তখন। ওর বাবার সাথে ওর মায়ের। তারপর হঠাৎ করেই বিয়ে। সোনিয়ার কাছে সব শুনে আমি হলদিয়ার থেকে ছুটে গিয়েছিলাম। ইউনিভাসিটির বন্ধুদের সাথে কথা বলে রেখেছিলাম। আমি লিলিকে নিয়ে পালিয়ে হলদিয়া চলে আসব।
‘আচ্ছা সেদিন তুমি আমার সাথে পালিয়ে যেতে রাজি হওনি কেন?’
‘খুব ভয় পেয়েছিলাম। পরেরদিন যখন ভেবেছিলাম আপনার সাথে পালিয়ে যাব। আর আপনাকে খুঁজে পাইনি। আপনি একটা দিন আমার জন্য অপেক্ষা করেননি।‘
বলেই লিলি মাথা নীচু করে ফেলল। ও কাঁদছে। সেদিন রাতেও মিলি কেঁদেছিল।
একদিন কত ভাবে জানতে চেয়েছি। কারো কাছে কোন সঠিক জবাব পাইনি। জানতাম পারিবারিক চাপে বিয়ে করতে চলছে। একসময় আমিও মেনে নিয়েছিলাম। আমার এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। কোন বুদ্ধিমান মেয়েই এই অন্ধকারে ঝাপ দিতে রাজি হবেনা। ভাবতে অবাক লাগে যে প্রশ্নের জবাব এতদিন পাইনি। আজ যখন পেলাম তখন মনে হচ্ছে, না জানলেই ভাল হত। এতদিন পর এসে নিজেই সব কিছুর জন্য দায়ী হয়ে গেলাম। নিজের কাছে, লিলির কাছে। তবু কেমন যেন নিস্তব্ধ মনে হচ্ছে নিজেকে। হঠাৎ ঝড় সব কিছু লণ্ডভণ্ড করে চলে যাবার ঠিক পর মুহূর্তে যেমন হয়। আজ এতগুলো বছর পর এসে আমি কি শান্ত। অথচ সেদিন যদি আর একটা দিন অপেক্ষা করতে পারতাম। তাহলে জীবনের গতিপথ অন্যরকম কিছু হয়ে যেতে পারত। লিলিকে বাসে উঠিয়ে দিতে গেলাম। ও একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না। এমনকি একবার ধন্যবাদ দেবার জন্যও না। অনেক বছর আগে একবার পিছন ফিরে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল। সে আবার একই ভুল করতে চায় না। ওর চলে যাবার সময়টায় বৃষ্টিতে দাঁড়িয়েছিলাম। হয়ত এটাই শেষ দেখা। মেদিনীপুরগামী সৌখিন পরিবহনের বাসটি যখন ধর্মতলা বাস টার্মিনাল থেকে ডানে মোড় নেয়, তখন লিলি একবার ফিরে তাকিয়েছিল। যেন সেই মিনতি ভরা কিশোরীর দুচোখে।
আমার পরিবহনের বাসটিও ছুটে চলেছে হলদিয়ার উদ্দেশ্য। বৃষ্টিমাখা সন্ধ্যার রাজপথে নিয়ন আলো জ্বলে উঠেছে। গাড়ীর সারি লাল-নীল আলো জ্বেলে থেমে থেমে ছুটে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে। লিলি চলে যাবার পর আমার মনে হচ্ছে সব ফাঁকা। কেমন যে হিম শীতল। যেন কতদিন পর আবার মনের ভিতর একটা ঝড় বয়ে গেল। জীবনের যান্ত্রিকতায় কত লাল-নীল প্রেম আসে প্রতি নিয়ত। সব অসার মনে হচ্ছে আজ। সেই কিশোর বয়সের প্রথম প্রেম এখনো মনের খুব গভীরে। গলা ছেড়ে কথাগুলো লিলিকে বলতে ইচ্ছে করছে খুব।
বেশ কয়েক মাস পরের কথা। এত বেশি বৃষ্টি হয়েছে যে মেদিনীপুর শহরের বিভিন্ন স্থানে জল জমে গিয়েছে। রাস্তায় জমে থাকা জলের জন্য লিলি আজকে কলেজে যেতে পারেনি। অনেকদিন পর চা হাতে নিয়ে আয়েশ করে ব্যালকনিতে বসল। এই উত্তরমুখি ব্যালকনিটা ওর খুব প্রিয়। সামনে খোলা মাঠ। আর মাঠ শেষ হলেই হলদি নদী। এখনো খবরের কাগজ আসেনি। তবে একটু আগে বাসার দারোয়ান একটা চিঠি দিয়ে গেছে। সরকারি হলুদ খামের চিঠি। প্রেরক এর ঠিকানায় কিছু লিখা নেই। চিঠিটা দেখে ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বরাবরের মতই সজাগ হয়ে উঠল। এই রকম প্রেরকের ঠিকানা বিহীন চিঠি অনেক দিন পর!
খুব বেশি কিছু লিখা ছিলনা। শুধুই কয়েকটি শব্দ।
‘প্রিয়তমাসু,
এখনো আমার শহরে অঝোরে বৃষ্টি হয়। সে বৃষ্টির ছোঁয়ায় নরম কদমফুল ফোটে। তবে এখন আর ভিজতে ইচ্ছে হয়না। বরং বৃষ্টি দেখলেই ভিজে জবুথবু হয়ে যাওয়া পাখির মত একা মনে হয় নিজেকে।‘
লিলি সামনের খোলা আকাশপানে তাকাল। ওদের বাসার সামনে ফাঁকা জায়গায় একটি উচু সুপারি গাছ। এর উপর একটি পাখি ভিজে শরীর ফুলিয়ে বসে আছে। খুব অদ্ভুদ রকমের একটা মায়া লাগছে দেখে। বাতাসের তোড়ে গাছের সাথে পাখিটি একবার এপাশ থেকে ওপাশে দুলছে। তবু কোথাও চলে যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে খুব একা। কেন জানি মিলির বুক ফেটে একটা তীব্র কান্না আসছে ভিজে চুপসে যাওয়া পাখিটির জন্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন