মধুর মিলন - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

বিগত কয়েক দিনের অসহ্য উত্তেজনা, উৎকণ্ঠার অবসান ,সেই প্রত্যাশিত শনিবার অবশেষে এলো | 
শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মলে মধুশ্রী এই প্রথমবার এসেছে | স্বাভাবিকভাবেই উৎকণ্ঠার, জড়তার শেষ নেই | চিরাচরিত অভ্যাসের বশে  সময়ের খানিকটা আগেই চলে এসেছে সে | কিন্ত বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করাটা খুব বিরক্তিকর, ভেতরে এসেও কি করবে কোথায় যাবে ঠাওর করতে পারছে না | এমন সময় ফোনে বেজে ওঠে “এই কথাটি মনে রেখো…. “, স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই আনমনে কল রিসিভ করে মধুশ্রী হ্যালো বলে | “ হ্যালো কিরে? আমি বলছি | কোথায় তুই? কখন থেকে ফোন করে পাচ্ছি না? “ ওপারের কণ্ঠস্বরের প্রত্যুত্তরে মধুশ্রী জানায় সে নির্ধারিত স্থানে, সময়ের আগেই পৌঁছে গেছে  |
“তাড়াতাড়ি উপরে উঠে আয়, ফুড কোর্টে “ মধুশ্রী কিছু বলার আগেই ফোনটা কেটে যায় |
চলমান সিঁড়ির কাছে গিয়ে থমকেও সে elevator - এর দিকে ফিরে আসে | ওঠার সময় কেমন একটা অস্থিরতা অনুভব করে ভেতরে, যা একটু আগে অব্দিও ছিলনা | দরজা খুলতেই তাঁর সামনে ব্লু জিন্স, ব্ল্যাক টি-শার্ট এ রবি |
“কি ম্যাডাম? অবাক করে দিলাম তো?
জানতাম তুই চলমান সিঁড়ি কিংবা elevator- এ আসবি | ভীতুর ডিম কোথাকার ! “
মধুশ্রীর মনে পড়ে গেল সেবারের বইমেলা যাওয়ার ঘটনাটা | রবি সেবার পেছন থেকে না ধরলে মেট্রো স্টেশনে নির্ঘাত চিৎপাত হত মেয়েটা | রবির দিক থেকে মুগ্ধতার দৃষ্টি সরানোর আগেই সে বলে বসল “খুব ক্ষিদে পেয়েছে মধু, কি খাওয়াবি বল? এদিকে আয়, টেবিল দখল করা আছে  |” মধুশ্রী রবির পদাঙ্ক অনুসরণ করে ওদের জন্য দখল করা টেবিলে এসে বসল|
ফুড কোর্টের  ভেতর থেকে দেখা যাচ্ছে কল্লোলিনী তিলোত্তমা কলকাতা | মধুশ্রীর দৃষ্টি সেদিকে পড়তেই রবি বলে ওঠে “এতটা আসতে কষ্ট হয়নি তো? তার উপর কি বুদ্ধি ম্যাডামের ? শাড়ি পরে এসেছেন !” এবার সত্যি খুব অপ্রস্তুত লাগে মধুশ্রীর | চারদিকে তাকিয়ে দেখে তাঁর বয়সী সব মেয়েই আধুনিক পোশাক পরিহিতা, মাথা নিচু করে সে |
“থাক হয়েছে, আর নাক ফোলাতে হবে না | ওমনি রাগ হয়ে গেলো | ভীড় ট্রেনে যাতায়াতের অসুবিধা, সেকারণেই বলা “ | চেয়ারটা মধুর কাছে টেনে আনতে আনতে বলছিল রবি কথাগুলো |
তারপরে দুজনে মিলে চলল , অর্ডার দিয়ে খাবার নিয়ে আসতে | 1টা মটন কবিরাজি আর 1প্লেট মিক্সড নুডল অর্ডার করে মধু জানতে চাইলো রবির আর কিছু লাগবে কিনা| “বাহ্ ! এখনো অনেক কিছু ভুলিসনি দেখছি ” বলে রবি মকটেল যোগ করে | দুই বন্ধু নিজেদের মধ্যে কিছু পুরনো দিনের কথা বলে | কিছুটা সময় কাটে স্মৃতি রোমন্থনের নিস্তব্ধতায়, অনেক না বলা কথাও  হয়তো শোনা হয়ে যায় | “আমাদের শেষ কবে দেখা হয়েছিল তোর মনে আছে রবি ?”  রবি কিছু বলতে পারলোনা কথার উত্তরে, ততক্ষনে কাউন্টারে খাবার এসে পৌঁছেছে | বিল মেটানো নিয়ে অনেক বাদ অনুবাদের পর অবশেষে হার মানে রবি ।নিজেদের সামলে ওরা সুস্বাদু খাবার উপভোগ করে | যুক্তিবাদী মধু ততক্ষনে প্রমান করতে সক্ষম হয়েছে যে রবির ইচ্ছাতেই এখানে ওর ট্রিট দিতে আসা |
মফস্বলে বেড়ে ওঠা রবীন ও মধুশ্রী খুব ছোটবেলার বন্ধু |  হায়ার সেকেন্ডারি
এর পর মধু লোকাল কলেজে নিউট্রিশন সায়েন্স নিয়ে অনার্সে ভর্তি হয় | রবির বাবা উত্তরবঙ্গে ট্রান্সফার হওয়ার সাথে রবি বায়োটেকনোলজি পড়তে ব্যাঙ্গালোর চলে যায় | মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় গোটা এক দশক | কেউ কারো কোনো খোঁজ পায়নি | খুব যে আগ্রহী ছিল ওরা একে অপরকে খুঁজে পেতে তাও নয়, তবু যেদিন প্রভাতের ফ্রেন্ড লিস্টে মধুকে প্রথমবার রবি ফেসবুকে খুঁজে পেল, অসম্ভব খুশি হয়েছিল সে | এক মুহূর্ত দেরি করেনি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে | কিন্তু মাস খানেকের উপর যখন সে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি, খুব অভিমান হয়েছিল তাঁর, ইনবক্স  করেছিল 1টা গান  - “এই কথাটি মনে রেখো…. “ | সেদিন সন্ধ্যা থেকেই ওরা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বীকৃত বন্ধু |
তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন কাজের  শত ব্যস্ততার মধ্যেও  দুজনই যোগাযোগ রেখে চলেছে | এবার নিতান্ত কাজের প্রয়োজনেই রবির কলকাতা আসা, তাও মাত্র 2-3দিনের জন্য | সেমিনার সেরে শুক্রবার রাত কিংবা শনিবার ভোরেই ফিরে যেতে পারতো সে, কিন্তু পারেনি -  হয়তো বা চায়নি | কলকাতায় আসার খবরটা প্রথম যেদিন রবি মধুকে জানায়, সে জানতে চেয়েছিলো ফেরার ফ্লাইট কবে? কিছু জানায়নি রবি সেদিন | বরাবরের আত্মাভিমানী মেয়েটিও আর কিছু জানতে চাইনি রবির কাছে | কলকাতা আসার দিন বিমান বন্দরে বসে আপডেট দিতে যাবে, এমন সময় যাত্রা শুভ হওয়ার বার্তা আসে তাঁর মুঠো ফোনে, ব্যস !
প্রত্যুত্তরে  রবির নির্দেশে আজকের সাক্ষাৎ পর্ব |
“রবি, এবার উঠতে হবেরে | এরপর ট্রেনে ওঠা চাপের হয়ে-যাবে, তাও আবার শাড়ি পড়ে। “
কথার শ্লেষ সেই অষ্টাদশীর মতোই আছে, বুঝতে অসুবিধা হলনা রবির | হাসি আজও নিষ্পাপ, যুক্তি অকাট্য আগের মতোই, অভিমান এক চুলও কমেনি, চেহারায় দীপ্তি,লাবণ্য সংযোজিত হয়েছে শুধু |
“উঠব তো বটেই| তবে অন্য কোথাও যাব ম্যাডাম, এখন তোমায় ছাড়ছিনা "| বলেই হাতধরে টেনে নিয়ে আসে রবি চলমান সিঁড়িতে  | বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাব এ ওরা উঠে বসতেই ক্যাব চলতে শুরু করে |
গোটা ব্যাপারটায় অপ্রস্তুত মধু তাঁদের গন্তব্যের কথা জিজ্ঞেস করলে রবি বলে জাহান্নমে নিয়ে যাচ্ছে সে মধুকে | উৎকণ্ঠা নিয়ে মধু গাড়িতে বসে থাকে গম্ভীর হয়ে, লুকিং গ্লাসের মধ্যে দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে নিজের মনেই হাসতে থাকে রবি | ময়দানের সামনে ওদের নামিয়ে গাড়ি চলে যাওয়ার পর খ্যাঁক খ্যাঁক করে অট্টহাসি হাসতে থাকে রবি, নানাভাবে সে পিছনে লাগতে থাকে মধুর | প্রথমে মধু কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলেও পরে সামলে নেয় নিজেকে | তাঁর নিজের মধ্যে কোথাও একটা খারাপ লাগাও কাজ করে, পারিপার্শিক পরিবেশের দুর্ঘটনার প্রভাবে নিজের বাল্যবন্ধুকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখার জন্য | ময়দানের আকাশ বাতাস ওদের হাসি আর খুনসুটির যুগলবন্দিতে যখন মুখরিত, ওঁরা অনুভব করে দুজন দুজনের এতটাই কাছে, যে উভয়ের নিঃশ্বাস সম্মিলিত হয়েছে | তৎক্ষণাৎ খানিক দূরে গিয়ে বসে মধু, পরিবেশ হালকা করতে রবি একথা সেকথা জিজ্ঞেস করতে থাকে | এতক্ষন অবধি সব ঠিক ছিল, কিন্তু কোথা থেকে যেন শ্রাবনের ঘন কালো মেঘ ঘিরে ফেললো ওদের উজ্জ্বল রোদেলা আকাশটাকে | রবি প্রথম জানতে চাইল মধু কেন একমাস ধরে তাঁর ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট  পেন্ডিং রেখেছিল?
উত্তর এলো :-
1) যাকে তাকে বন্ধু বানাতে মধুর ভালো লাগেনা,
2) প্রোফাইলে নিজের ছবি না থাকা লোকেরা fake হয় -
কথা টি শুনে রবির মাথা হঠাৎই গরম হয়ে গেলো |
তাঁর পুরুষালি ইগো প্রশ্ন করে বসল “রবীন বাগচী নামটা যথেষ্ট ছিল না নাকি? “
সপাটে জবাব এলো ঐ নামে পৃথিবীতে না জানি কত…
“থাক থাক অনেক হয়েছে, 10বছরে দেমাক একটুও কমেনি দেখছি? “বলে মধুর দিকে তাকায় রবি |
“এটা দেমাক নয় রবি , আত্মসম্মান ” ছলছল চোখে বলতে থাকে মধু “সেদিন ও সরে গেছিলাম তোর অগ্রগতি চেয়ে আর তুই ও তোর প্রিয়তমার মাঝে অন্তরায় হবনা বলে | সিমকার্ড নষ্ট করে ফেলেছিলাম সেদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে, যাতে ভুলেও আমি তোর সাথে বা তুই আমার সাথে যোগাযোগ করতে না পারিস "|
“বেশ করেছিলি | কিন্তু কি লাভ হল তাতে? না টিকলো আমার সে প্রেম, না থাকলাম..”
কথা শেষ করতে পারলোনা রবি , বিষম লাগলো আচমকা | ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে পরম স্নেহে রবির দিকে এগিয়ে দিল মধু মাথায়, পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে | “এই স্পর্শটারই অভাব ছিল জানিস? এতো মেয়ের সাথে প্রেম করেছি এতো দিন, কিন্তু… “|
কথার মাঝপথে  “সব ছেলেরাই একইরকম বিরক্তিকর “ বলে উঠতে যায় মধু, ওমনি  রবি  হ্যাঁচকা টান দেয়| রবির বুকের উপর আছড়ে পড়ে মধু |
গোধুলির সূর্যাস্তের রং যেন রবিকেও তাঁর তেজ মাখিয়ে দিয়েছে |
“কি হচ্ছে কি? ভালো হবেনা কিন্তু, ছাড় আমায় " বলে ওঠার বৃথা চেষ্টা করে মধু |
“আমি কি তোর ছাত্র যে ভয় দেখাচ্ছিস?
ছাড়বো বলে কলকাতা শহরে একাকী 2দিন ধরে পড়ে আছি না? 5-6মাস ধরে দেখা করার জন্য  ছটফট করছি, তার কোনো দাম নেই? ”
নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে মধু জানায় 10বছর 7মাস 23দিন কোনো মেয়ে কারো জন্য অপেক্ষা করে থাকতে পারে না, তাঁর জীবনে নতুন কেউ চলে আশা অস্বাভাবিক নয় | নিজে না চাইলেও অনেক সময় পরিবেশ, পরিস্থিতি মধ্যবিত্ত পরিবারের আঠাশ উত্তীর্ণ, চাকুরীরতা মেয়েকে বাধ্য করে সুপাত্র নির্বাচন করতে | সেদিকটা বোধহয় আজ অবধি ভেবে দেখতে পারেনি রবি |
এতক্ষনে সে সম্বিৎ ফিরে পায় | মধুকে তাঁর বাহুডোরে আরো দৃঢ়ভাবে বেঁধে ফেলে বলে “দুর্ভাগ্যবশত এমন কোনো সম্ভাবনা তৈরী হয়ে থাকলে আমার মধু সব কিছু ফেলে আমার কাছে আসতো না | ”
“এই বয়সে এসে, নতুন করে প্রেমে পড়তে বড্ডো  ভয় করে জানিস? ” রবির কানে কানে বলে মধু |
“চিন্তা করিসনা, রাত নামার আগেই তোর একনায়ক বাপের কাছে পৌঁছে দেবো তোকে আর চেয়ে নেবো আমার জন্য |”
রবিকে থামিয়ে কিছু একটা বলার উপক্রম করতে  যায় মধু, তখনি ওর ঠোঁট দুটি বাইরে থেকে প্রযুক্ত বল দ্বারা অবস্থার পরিবর্তনে বাধ্য ও বাধিত হয় |
রবির ফোনে মৃদুস্বরে বেজে ওঠে সেদিনের ইনবক্সের সেই  গান - “এই কথাটি মনে রেখো….…."

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।