ভালোবাসার হাসি - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
এটা একটা বাংলার কোন এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মিষ্টি প্রেমের গল্প, যেখানে আর পাঁচটা সাধারণ ছেলে মেয়ের মতন এরাও একে অপরকে ভালোবেসে ফেলে। ভালোবাসা চিরকালই অন্ধ - যেহেতু ছেলেটি এখনও পড়াশুনা করে, ভবিষ্যত এখনও অনিশ্চিত। মেয়ের পরিবার চিরাচরিত নিয়মে ছেলেটাকে গ্রহন করতে অস্বীকৃতি জানায়। স্বাভাবিকভাবেই মেয়ের পরিবার মেয়েটাকে বুঝানোর চেষ্টা করে যে ছেলেটার খুব একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত নেই এখন , পরে কী হবে এই অনিশ্চয়তার জন্য তার সাথে সম্পর্ক রাখাটা বোকামি ছাড়া আর কিছু না।
পরিবারের চাপে পড়ে একদিন মেয়েটা ছেলেটাকে বলে, “আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা কতটা গভীর? তুমি একটা কিছু অন্তত করো, আমাদের ভালোবাসাকে সফল করার জন্য । তাছাড়া আমাদের সম্পর্ক কেউ মেনে নেবে না।” ছেলেটা কোন উত্তর খুঁজে পায় না। সে চুপ করে থাকে। মেয়েটা রাগ হয়ে চলে যায়। তারপরেও স্বপ্নবিলাসী ছেলেটা তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, কিছুটা অঞ্জন দত্তর গানের মতো, “সাদা-কালো এই জঞ্জালে ভরা মিথ্যে কথার শহরে, তোমার-আমার লাল-নীল সংসার।” মনে মনে ঠিক করে আর শপথ নেয় যে সে একটা কিছু এমন করবে যাতে তাঁদের ভালোবাসা হেরে না যায় - তার প্রিয়তমাকে অন্যদের কাছে ছোট হয়ে না যেতে হয়। তার সামনে একটাই রাস্তা সহজ মনে হলো, আরো পড়াশুনা করে নিজেকে আরো যোগ্য করে তোলা - কারণ অন্য পথগুলো এর থেকে অনেক বেশী কঠিন জীবনে।সে বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন প্রফেশনাল কোর্স -এর ব্যাপারে খোঁজ খবর করতে লাগলো। এই পৃথিবীতে কোন পরিশ্রম যদি মনে প্রাণ দিয়ে করা যায়, তাই বিফলে যায় না।
অবশেষে ছেলেটা একদিন হায়ার-স্টাডিসের জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাওয়ায়, বিদেশে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু মেয়েটি এ ব্যাপারে মনে মনে খুশি হলেও এক অজানা ভয়ে ভয় পেতে থাকে।যাওয়ার আগ-মুহূর্তে তার ভালোবাসার এই অবস্থা দেখে সে মেয়েটাকে বলে, “আমি হয়তো কথায় খুব একটা পারদর্শী না, কিন্তু আমি জানি যে আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তারপরেও তুমি যদি চাও, তোমার-আমার বিয়ের কথা আমি তোমার পরিবারকে একবার বলে দেখতে পারি। তুমি কি আমার সাথে সারাজীবন কাটাতে রাজি আছ?”মেয়েটা ছেলের দৃঢ়-সংকল্প ও কর্ম - উদ্যম দেখে রাজি হয়। ছেলেটি মেয়েটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করে এবং অনেক বুঝিয়ে রাজি করে ফেলে।মেয়ের পরিবারও ছেলেটির প্রাণঢালা ভালোবাসা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে অভিভূত হয়ে যায়।মেয়ের বাড়ি আর আপত্তি করে না, তারপর তাদের এনগেজমেন্ট হয়ে যায় এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ছেলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দেশে ফিরলে তারপর তাদের বিয়ে হবে। এরপর ছেলেটা চলে যায় দেশের বাইরে।এদিকে ছেলেটি বিদেশে চলে যাবার পর, একটা শূন্যতা অনুভব করতে শুরু করে মেয়েটি, সময় আর কাটতে চায় না। কাজ তো একটাই তখন - প্রবাসী প্রেমিকের কথা মনে ভাবা আর ভবিষ্যতের
কথা স্বপ্নের মালা গাঁথা। তবুও তাতে সময় আর কত কাটে, বাধ্য হয়ে সে তখন কাজের চেষ্টা শুরু করে। এভাবে চেষ্টা করতে করতে একদিন সে একটি চাকরি পেয়ে যায়।মেয়েটা একটা অফিসে কাজ করা শুরু করে দেয়। এদিকে ছেলেটাও তার রিসার্চ-ওয়ার্ক নিয়ে দেশের বাইরে ব্যস্ত। কিন্তু তারপরেও তারা শত ব্যস্ততার মাঝেও ফোন আর ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের ভালোবাসার অনুভূতি যতটা সম্ভব আদান-প্রদান করে।
বেশ সুন্দর ভাবেই দিন কাটছিলো দুজনের আর ধীরে ধীরে এক এক করে তাঁদের প্রতীক্ষার দিনের অবসান ঘটছিল। কিন্ত ভগবান বোধহয় একছত্র সুখ মানুষের কপালে লেখেন না - যদি কোনও ব্যতিক্রম দেখা যায়, তাঁরা সৌভাগ্যবান।অতএব এদের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হবে কেন? একদিন মেয়েটা অফিসে যাওয়ার পথে পথ - দুর্ঘটনার কবলে পরে । জ্ঞান ফেরার পরে সে দেখতে পায় যে সে হাসপাতালে ভর্তি এবং বুঝতে পারে যে সে মারাত্মকভাবে আহত। তার বাবা-মাকে বিছানার পাশে দেখতে পায় সে। তার মা কাঁদছে তা বুঝতে পেরে যখন মেয়েটি কথা বলতে যায় তখন তার গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছে না। সে বুঝতে পারে যে তার বাকশক্তি লোপ পেয়েছে। ডাক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী মেয়েটা তার ব্রেনে আঘাত পাওয়ায় সারাজীবনের মতো বোবা হয়ে গেছে।এরপর মেয়েটি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে। একসময় মেয়েটা খানিকটা সুস্থ হয়ে বাসায় চলে আসে। এদিকে ছেলেটা তাকে বার বার ফোন করতে থাকে কিন্তু মেয়েটা এর কোনও উত্তর দিতে পারে না, তার উপর বোবা বলে তার করার কিছুই থাকে না। মেয়েটা একদিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল । সে তার নির্বাক এই জীবনের সাথে ছেলেটাকে আর জড়াতে চায় না। কিন্তু বারবার ছেলেটির ফোন আস্তে থাকে, মেয়েটির খারাপ লাগাও বাড়তে থাকে। তার ফলশ্রুতিতে সে একদিন একটা মিথ্যা চিঠিতে লেখে যে সে আর ছেলেটার জন্য অপেক্ষা করতে পারবে না। তারপর মেয়েটা চিঠির সাথে তার এনজেজমেন্ট রিং ছেলেটির ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়। ছেলেটা মেয়েটাকে হাজার-হাজার ই-মেইল করে কিন্তু তার কোন রিপ্লাই সে পায় না। ছেলেটা শত-শত বার ফোন করে কিন্তু মেয়েটার ফোন রিসিভ না করে নীরবে কাঁদা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
এদিকে আবার একদিন মেয়েটার পরিবার বাসা বদল করে অন্য কোন এলাকায় নতুন কোন একটা পরিবেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যাতে করে মেয়েটা কিছুটা হলেও এই দুঃস্মৃতি ভুলে যায় এবং সুখে থাকে।
জীবন তো আর থেমে থাকে না - বাধ্য হয়ে জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য নতুন পরিবেশে মেয়েটা “সাইন-ল্যাংগুয়েজ” শেখে এবং নতুন জীবন শুরু করে। বছর দুয়েক পর একদিন মেয়েটার এক বান্ধবী মেয়েটার এখানে চলে আসে এবং মেয়েটাকে বলে যে ছেলেটা দেশে ফিরে এসেছে । মেয়েটা তার বান্ধবীকে অনুরোধ করে যাতে ছেলেটা কোনভাবেই যেন তার এই অবস্থার কথা জানতে না পারে। তারপর কয়েকদিন পর মেয়েটার বান্ধবী চলে যায়।তারপর সব কিছু ঠিকমত চলতে থাকে, কিন্তু একটা অসম্ভব মনের কষ্ট মেয়েটাকে ভিতরে ভিতরে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে থাকে।
আরো এক বছর পর আবার একদিন মেয়েটার বান্ধবী মেয়েটার কাছে একটা নিমন্ত্রণ পত্র নিয়ে চলে আসে। মেয়েটা সেটা খুলে দেখতে পায় যে এটা ছেলেটার বিয়ের নিমন্ত্রণ পত্র। মেয়েটা অবাক হয়ে যায় যখন পাত্রীর জায়গায় তার নিজের নাম দেখতে পায়। মেয়েটা যখন তার বান্ধবীর কাছে এ সম্পর্কে কিছু জানতে চাইবে তখন সে দেখতে পায় যে ছেলেটা তার সামনে দাঁড়িয়ে। ছেলেটা তখন “সাইন ল্যাংগুয়েজ” ব্যবহার করে মেয়েটাকে বলে, “I’ve spent a year’s time to learn sign language. Just to let you know that I’ve not forgotten our promise. Let me have the chance to be your voice. I Love You.” এই বলে ছেলেটা আবার সেই এনগেজমেন্ট রিং মেয়েটাকে পড়িয়ে দেয়। কয়েক বছর পর মেয়েটা আবার হেসে উঠে। এ যেন এক নীরব ভালোবাসার নীরব হাসি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন