অপূর্ণ ভালোবাসা-পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

জীবন কখনোও থেমে থাকে না। জীবন চলে তার মত, তবুও মাঝে মাঝে কারোর জন্য মনটা থেমে যায় ।তখন মনের ভিতর কোন এক সময়ের লুকিয়ে থাকা কিছু স্মৃতি গুলো  উঁকি দেয়।
ক্ষনিকের মধ্যে হঠাৎ করেই মনটা মলিন হয়ে যায় । 

কত ইচ্ছে ছিলো।কত স্বপ্ন ছিলো।সব কেমন যেন হঠাৎ করে  মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় । স্তব্ধ হয়ে থাকে স্মৃতিগুলো, পড়ে থাকে বছরের পর বছর।এক সময় ভুলে যাই আবার মাঝে মাঝে মনে হলে চোখের জল গুলো ঝরে যায় । 

আমি মিমি ।সবে মাত্র দশম শ্রেনিতে পড়ি।সবার জীবনে কোন না কোন প্রিয় মানুষ বা প্রিয় বন্ধু প্রায় থাকেই।আর সেই প্রিয় বন্ধু গুলো কে হঠাৎ করেই কেন জানি ভালো লেগে যায় ।কাছের বন্ধুটি কেন জানি এক সময় প্রিয় স্হান টা দখল করে নেয় । তখন কেউ খুব সহজেই বলে দিতে পারে মনের কথাটা,আবার কেউ বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও বলতে পারে না। 

স্বপন আর আমি একই সাথে পড়তাম।দুজনের বাসা একই গ্রামে হওয়াতে দুজন একই সাথে স্কুলে আসা যাওয়া করতাম।আমরা খুব ভালো বন্ধু ছিলাম।এক সাথে স্কুলে যাওয়া প্রাইভেট পড়া ইত্যাদি। 

আমরা দুজনে দুজনকে তুই করে বলতাম।মাঝে মাঝে স্বপনের ব্যবহারে আপসেট হয়ে যেতাম।মাঝে মাঝে এমন ব্যবহার করতো মনে হতো দুজন যেন প্রেমিক প্রেমিকা।
ক্লাস করার সময় কেমন জানি তাকিয়ে থাকতো। এটা অবশ্য খেয়াল করেছিলাম।যদিও তখন আমরা অনেকটাই ছোট। 

স্বপন ছিল বোকা টাইপের ছেলে।এই জন্যই বোকার মত চেয়ে থাকতো।কিছু বলতো না।আমি তেমন কখনো ভাবিনি ওর বোকার মত চাহনিতে কতটা মায়া কতটা ভালোবাসা লুকানো ছিলো।সে আমাকে বলেছিল ভালোবাসি, কিন্তু আমি তাকে ওই ভাবে কোন দিন ভাবিনি।আমি সব সময় ওকে খুব ভালো একজন বন্ধু হিসাবে ভাবতাম।আর একজন ভালো বন্ধুই একজন ভালো প্রেমিক হতে পারে।আর একজন ভালো প্রেমিকই তো লাইফ পার্টনার হতে পারে। 

একদিন আমি আর স্বপন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম।তখন একটা ছেলে আমাকে প্রপোজ করে।যদিও স্বপনের সামনেই না করে দিয়েছিলাম।তবুও কেন জানি সেদিন স্বপনের মুখের দিকে তাকানোই যাচ্ছিল না।কেমন যেন হাসি মাখা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে মেঘের মত কালো হয়ে গিয়েছিল।তখন আমি বুঝতে পারিনি সেদিন কেন এমন হয়েছিল - যদিও আজ বুঝতে পেরেছি। 

সেদিনের পর থেকে স্বপন  স্কুলে আসেনি কয়েক দিন।আমি তার খবর নিতে ওর বাসায় গেলাম,
আমাকে দেখা মাত্রই কান্না শুরু করে দিলো।কাঁদছে কেন জিজ্ঞাসা করতেই বলল ওই ছেলেটার সাথে কথা বললাম কেন? আমি ওকে বোঝালাম,দেখ আমি তো কথা বলতে চাইনি - ও নিজের থেকে এসে প্রপোজ করেছে।ও বলল আমি যেন তার সাথে কথা না বলি।আমি মেনে নিলাম কারন স্বপন আমার বেস্ট ফ্রেন্ড । আমরা সব কিছু শেয়ার করতাম।এমন কি আমি সেন্টার ফ্রেশ বেশি খেতাম, সেই  সেন্টর ফ্রেশও শেয়ার করে খেতাম। 

কেটে গেল কয়েকটি মাস, সব এভাবেই চলছিল।স্কুল লাইফটা সত্যিই খুব ভালো কাটছিল।দিন গুলো কোথা দিয়ে কেটে যাছিল বুঝতে পারছিলাম না ।আমি কখনে ভাবিনি স্বপন আমাকে প্রপোজ করবে। স্বপন আমাকে হঠাৎই একদিন প্রপোজ করে।আমি তাকে না করে দিলাম।কারন তাকে কখনো বন্ধুর থেকে বেশি কিছু ভাবিনি।আমি আগে থেকেও জানতাম  যে  আমার প্রতি ওর দুর্বলতা আছে।তার পর ওর সাথে বহু দিন কথা বলিনি রাগে, প্রপোজ করার জন্য। 

কিছুদিন পর অর্ধ বার্ষিক পরীক্ষা চলে আসলো।দুইটি পরীক্ষা দেয় নি স্বপন ।কেন জানি খবর নিতে ইচ্ছে করছিল।তাই ওর বাসাতেই চলে গেলাম।ওর মার সাথে দেখা।ওর মাকে জিজ্ঞেস করতে বললো, জ্বর এসেছে দুদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না তেমন।ওর পাশে গিয়ে বসলাম মুখটা ফুলে আছে মনে হয় দুদিন খুব কেঁদেছে। 

আমার হাতটা ধরে খুব কান্না শুরু করে দিলো।বলল প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না আমি তোকে ছাড়া বাঁচবো আমি তোকে ভীষন ভালোবাসি।মুহূর্তেই মনটা কেমন জানি  হয়ে গেল ওর কান্না দেখে।খুব মায়া লাগলো ওর জন্য।নিজের অজান্তে আমিও কেঁদে ফেললাম। 

কিন্ত আমি কেঁদেছিলাম কেন? ওকে তো আমি ভালোবাসি না, তাহলে আমি কাঁদছিলাম কেন? ওর জন্য আমার মায়া হয়েছিল কেন? এই কথা গুলো এখনো মাঝে মাঝে ভাবি। সত্যিই ওর জন্য মায়া হয়েছিল, খুব মায়া হয়েছিল হয়ত ওকে ভালো বেসে ফেলেছিলাম এই জন্য।
ওকে বুঝিয়ে কিছু খাওয়ালাম।বললাম ঠিক আছে তৃই যা বলবি তাই হবে।খুব ভালো চলছিল দিন গুলি। সতিই খুব ভালো চলছিল।দেখতে দেখতে টেষ্ট পরীক্ষা চলে আসল, আমিও প্রম্তুতি নিলাম ভালোভাবে পরীক্ষাটা দেওয়ার জন্য। দেখতে দেখতে পরীক্ষাটা শেষ হয়ে গেল।খুব ভালো পরীক্ষা দিলাম। 

এরমধ্যে একদিন একটা খবর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম।এক উকিলের ছেলের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।আমার মত ছাড়াই আমাদের বিয়ের কথা সব পাকা হয়ে গেছে।মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল বাবার কথাটা শুনে। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। ছেলেটাকে আমি চিনতাম বাবার বন্ধুর ছেলে।আমি তাকে দাদা বলে ডাকতাম। 

সেদিন সারা রাত কেঁদেছিলাম স্বপনের জন্য।কেউ দেখেনি সেই কান্নাটা, কেউ বোঝেনি - বুঝতেও চায়নি।কেউ ভাবেও নি আমার মত ছিলো কি না?। সারা জীবনের জন্য যার সাথে থাকতে হবে তাকে আমার প্ছন্দ হবে কিনা তার জন্য একবার আমার মতটাও নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। 

আমাদের মত মেয়েরা কি বাবা মার কাছে এতই বোঝা হয়ে যাই? যার কারনে নিজের খুশি নিজের ইচ্ছা আকাঙ্খাগুলো মাটি চাপা দিয়ে বাবা মায়ের প্ছন্দ করা কাউকে মেনে নিতে হয়।আমাদের তো অধিকার আছে।তাহলে কেন বুঝতে চায় না কেউ আমাদের এবং আমাদের সমাজে ।সবাই শুধু ভাবে বিয়ে হয়ে গেলেই  হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। কি অদ্ভুত আমাদের সমাজ? 

স্বপনের জন্য খুব কষ্ট হতো খুব কাঁদতাম।কত রাত কেঁদে পার করেছি স্বপনের কথা ভেবে।কি লাভ সেই কান্নার -  কোন লাভ নেই।কোন মুল্য নেই   সেই কান্নার  - সমাজের কাছে,সমাজের মানুষের কাছে।একদিন শুনলাম স্বপনকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ১ মাস কেটে গেলো তবুও স্বপনের কোন  খোঁজ নাই।আর কেউ না জানুক আমি জানি সে কেন বাসা থেকে চলে গেছে,হয়ত কষ্টটা সইতে পারেনি।খুব ভালো বাসতো আমায় ।এরপর 
একদিন খোঁজ পাওয়া গেল স্বপনের । শুধু দেখলাম প্রায় মরার মত অবস্হা।ছেলেটা সত্যিই বোকা,খুবই বোকা - কাউকে বুঝতেই দেয় নি এমন হয়েছে কেন? সবাই বোঝানোয় নাকি ফাইনাল পরীক্ষাটা দিয়েছিলো।সে এখন ভালো আছে খুব ভালো আছে। আমিও চাই সে খুব ভালো থাকুক প্রতিটা দিন প্রতিটা ক্ষন প্রতিটা সময়,,,,,,

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।