পোড়োবাড়ির গল্প - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

দুপুর। চারদিকে সুনসান নিরবতা। উঠোনের পাশে এক দঙ্গল বাচ্চা নিয়ে কুটকুট করছে মা মুরগী। ঘরের ছায়ায় ঝিমুচ্ছে একটি কুকুর। নিশ্বাসের সাথে উঠানামা করছে হৃৎপিন্ড। হঠাৎ দমকা হাওয়ায় গাছের ডালপালা কেঁপে ওঠে। জোরে আছাড় খায় জানালার পাল্লা। বাতাসে তার প্রতিধ্বনি ঝুলে থাকে কিছুক্ষণ। 

প্রমোদ ঘুমাচ্ছিল। জানালার সশব্দ উল্লাসে জেগে ওঠে। এতে বরং ভালই হল। আরেকটু ঘুমালে হাট ধরতে পারতনা আজ। মুখে জলের ছিটা দিয়ে দ্রুত বিল থেকে গরুগুলো এনে গোয়ালঘরে বাঁধে। রওয়ানা হয়। যেতে যেতে গান ধরে “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইবনা আর বেশিদিন তোদের মাজারে। হায়রে ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে!” প্রমোদের সুর বিলের বিলের বিস্তীর্ণ প্রান্তর ভেদ করে খুঁজে নেয় আকাশের কিনারা। 

প্রমোদের মা ঘুমুচ্ছিলেন। ঘুম ভেঙ্গে যায় কোন এক দুঃস্বপ্নে। মনে করতে পারছেন না ঠিক কি দেখেছিলেন। কিন্তু ছেলের জন্য প্রাণ কেঁদে ওঠে। জাভেদকে ডাকেন। কোথায় প্রমোদ ! মায়ের ডাকে জবাব দেয় গরুগুলো। ওগুলোর হাম্বা হাম্বা রবে গোয়ালঘরে ঢোকেন মা। গরুগুলোর সামনে পানি দিয়ে আবার এদিক ওদিক খোঁজা শুরু করেন ছেলেকে। বিলের মধ্যে পাশের বাড়ির অমিতকে দেখে ডাক দেন,
-ও অমিত ! আমাগো প্রমোদরে দেখছো নি বাবা ?
-প্রমোদ তো হাটের দিকে গেলো দেখলাম কাকিমা !
-ও আইচ্ছা।
যদিও ঘুম থেকে উঠেই বুঝেছেন ছেলে হাটের উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেছে। তবু কেন তার প্রাণ অজানা আশংকায় দুলে দুলে উঠছে? কিছুতেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছেন না। আজ হঠাৎ কেন এমন হল ? প্রমোদের বাবা দুবাই যাবার সময় এমন অনুভূতি হয়েছিল। আজ আবার সেই পুরনো স্মৃতি! ‘তাইলে কি প্রমোদও অর বাপের মত আর ফিরা আইবনা!’ গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। তবু মনে সংশয়! ‘হুদাহুদি কানলে মাইনষে কইব কি !’ বুকে পাথর বেঁধে অপেক্ষা করতে থাকেন কোন এক অশুভ সংবাদের। 

বিলের শেষে খালটায় পানি নেই বললেই চলে। হাঁটু পানি পার হয়ে হাটের কাছে পৌঁছে যায় জাভেদ। আজ তার মনে অফুরান ফূর্তি। একটার পর একটা গান গেয়েই চলেছে। এবার ধরেছে “তোরে পুতুলের মত করে সাজিয়ে হৃদয়ের কোঠরে রাখবো, আর হৃদয়ের চোখ মেলে তাকিয়ে সারাটি জীবন ভরে দেখবো....” 

সূর্য ঢলে পড়েছে অনেক আগে। ‘দুপুরে ঘুমাইলে এই এক সমস্যা! ঘুম কখন ভাঙব ঠিক নাই। ধুর হালায় তাড়াতাড়ি করতে গিয়া দেহি টর্চ আনতে ভুইলা গেছি। এহন বাড়িত ফিরার লাইগা আবার কার জন্য খাড়াই থাকতে হয় কে জানে!’ হঠাৎ শব্দটা কানে আসে। একদল গ্রামবাসী লাঠি সোটা নিয়ে তাড়িয়ে নিয়ে আসছে সাত আটজনকে। আবছা আলোয় মানুষগুলোর চেহারা চেনা যায়না। ডাকাত ডাকাত ধর ধর- এই সব শব্দের তোড়ে তাড়া খাওয়া লোকদের মুখের কোন শব্দ বোঝা যায়না। এদিকে হাটের দিক থেকেও ডাকাত ডাকাত রবে বের হয়ে আসছে আরেকটি জনস্রোত। কোন এক অপার্থিব টানে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রমোদ । ওর মনে পড়ে, গতবছর হাটে ডাকাতদের গুলিতে তিনজন মারা গিয়েছিল। পাশের গ্রামের স্বপনও মারা যায় সেদিন। মনে মনে একটা ডাকাতের বুকে লাথি মারে প্রমোদ । 

ভিড়টা তীর বরাবর ওর দিকেই ছুটে আসছে। একটু সরে যাওয়া দরকার। কিংবা লাঠি নিয়ে ডাকাত মারার জন্য তারও কিছু করা দরকার। কিন্তু সরতে পারেনা। কেন এমন হল! পা নড়ছেনা কেন! আতঙ্ক গ্রাস করে প্রমোদকে । আশপাশে আর কোন হাটুরেও নেই যে তাকে ডেকে একটু সাহায্য নেবে। একি হল তার! সে খেয়াল করতে থাকে দুই দিক থেকে আগুয়ান দুটি জনস্রোত বন্যার জলের মত তেড়ে আসছে দ্রুত। যেন এক্ষুণি গ্রাস করে নেবে সব। 

তাড়া খাওয়া লোকগুলো প্রাণের ভয়ে দৌড়াচ্ছে। কাছা খুলে যাওয়ায় ধুতির সাথে পেঁচিয়ে একজন পড়ে গেল। সাথে সাথে কয়েকটি বাড়ি পড়ল তার মাথায়। রক্ত বের হলেও এখান থেকে বোঝা যাচ্ছেনা। উঠে আবার দৌড়াতে চাইল। কিন্তু আজ বোধহয় তার মরণসময়। আঘাতের পর আঘাত মাটিতে শুইয়ে দিল। পাশব উল্লাসে যেন মেতে উঠেছে জনসমুদ্র। এতদিনের জমানো ক্রোধ উপশমের একটি উপায় পেয়েছে আজ। হাতছাড়া করতে রাজী নয় কেউ। 

তাড়া খাওয়া লোকগুলো হঠাৎ একেকজন একেকদিকে দৌড় দিল। জনস্রোত ভেঙ্গে গেলো। পাঁচ ছয় ভাগ হয়ে তস্করদের ধাওয়া করতে লাগল। পড়ে যাওয়া তস্করকে মারতে গিয়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়া জনস্রোতটি সরাসরি এসে পড়ল প্রমোদের উপর। একটু থমকে প্রমোদের দিকে তাকায়। ‘না, ওরে তো ঠিক ডাকাইতগো মত মনে হইতেছে না।’ দ্বিধান্বিত জনস্রোতকে উস্কে দেয় পেছন থেকে আসা আরেকটা স্বর। ‘ধর শালারে। শালায় জামা পইরা লাট সাজছে। ভাবছে কি শালায় আমরা চালাকি বুঝিনা !’ সাথে সাথে আরো চার পাঁচটা কণ্ঠ বলে উঠে ‘ধর ধর ধর’। এবার যেন প্রমোদের পা নড়ে উঠে। প্রাণের তাগিদে দৌড়াতে থাকে। হাটের দিকে নয় দিকভোলা মানুষের মত এদিক ওদিক। 

দ্রুত ধরে ফেলে আগুয়ান জনস্রোত। আঘাতে আঘাতে লুটিয়ে পড়ে একটি তাজা প্রাণ। হঠাৎ যেন প্রমোদের চোখ খুলে যায়। উঠানের পাশে নতুন শশা গাছটায় শশা ধরেছে। মা বলছে ‘তাড়াতাড়ি বিয়া কইরা নতুন বউ ঘরে আন। এত সোন্দর নতুন বাড়ি, নতুন বউ না অইলে মানায়?’ প্রমোদ হাসে। লাজুক। মায়ের সাথে এইসব কথা বলতে ভীষণ লজ্জা পায়। মা টা যে কবে এসব বলা বাদ দিবে! হঠাৎ দেখে ঘরের দরজায় লাল শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে নতুন বউ। মা কি তবে ওকে না জানিয়েই নতুন বউ নিয়ে আসল? প্রমোদ গান ধরে, “ মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, পাপোস বানাইয়া দিলেও ভবে শোধ হবেনা, এমন দরদী ভবে কেউ হবেনা আমার মাগো...” 

অন্ধকারে টর্চ জ্বালায় একজন। লাশগুলোর উপর ঘুরাঘুরি করে। টেনে খালের কিনারে নামায়। হাত দিয়ে পানি ছুড়ে মারে লাশের মুখে। কেউ একজন চিনতে পারে প্রমোদকে ।
-হায় হায় করছস কি! এইডা তো আমাগো গেরামের প্রমোদ । অরে পাইলি কই ?
-আরে হালারা সব একদলের। সবকয়ডা নৌকার মইদ্যে ঘাপটি মাইরা আছিল।
-ওই তুই চুপ করবি। অরে বিকালেও আমি দেখছি বিলে গরু চরাইতে। আর তুই কস অয় আছিল ডাকাইতগো লগে?
-ডাকাইতগো লগে না থাকলে দৌড় দিব ক্যান ?
-দৌড় দিছে মানে ? তোরা মারার লাইগ্যা অর দিকে দৌড়াই যাইতাছস আর অয় দৌড় দিব না তো কি খাড়াই খাড়াই মাইর খাইব? ওই হারামীর পোলা! তোরা যখন ডাকাইতগো দৌড়ানি দিছিলি তখন কি অগো মইদ্যে লাল শার্ট পরা কেউ আছিল?
-হ হেইডা তো আছিলনা।
-তাইলে এইডা তোরা কি করলি ?
-এহন কি হইব মেম্বার সাব ? 

মেম্বার চুপ। কণ্ঠরুদ্ধ সম্মিলিত জনস্রোত। ধীরে ধীরে ফিসফাস গুঞ্জন বাড়ে। ডাকাত মারতে গিয়ে একজন নিরীহ মানুষও মেরে ফেলেছে তারা। উপস্থিত মানুষগুলোর চোখে চোখে ঘৃণার জায়গা দখল করে নোনা অশ্রুর ধারা।একজন গলা ছেড়ে বিলাপ শুরু করে। ‘হায় ভগবান,এইডা কি করলাম’। কিছুক্ষণের মধ্যে থানা থেকে পুলিশ আসবে। এই ঘটনা জানতে পারলে বিপদে পড়বে সবাই। অস্থির গলায় কেউ একজন চিৎকার করে ‘কিছু একটা করেন মেম্বার সাব, পুলিশ তো আইয়া পড়ল’। মেম্বারের ভরাট গলায় আস্থা পায় সবাই,
-হোন, আমি যা শিকাইয়া দিমু হেই অনুযায়ী সবাই কথা কবি। এর বাইরে গেলে কিন্তু সবাইরে ফাঁসীতে ঝুলতে হইব। 

পরদিন সকালে প্রমোদের লাশ আসে। ছেলের লাশ দেখে মাও লাশ হয়। নতুন বাড়িতে নতুন বউ আর আসেনা। নতুন বাড়ি পোড়োবাড়ি হয়ে যায় দ্রুত। সম্পদগুলো ভাগাভাগি করে নেয় আত্মীয়স্বজন। 

প্রমোদ ডাকাতের বাড়িতে এখন মানুষ যেতে ভয় পায়। ‘রাইত বিরাইতে এইখানে অনেক মানুষের ঘাড় মটকাইছে প্রমোদ ডাকাইত । বাইচ্চা থাকতে মাইনষের বাড়ি ডাকাতি করত। আর মইরা গিয়াও মাইনষেরে শান্তিতে থাকতে দেয়না বদমাইস ব্যাটা।’

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।