বড়দিনের উপহার - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
সেদিন রাতে উঠোনে বাবার গলা শুনে, পড়ার বইটা রেখে ঘর থেকে উঠে গেল বনানী ।।
-এই তো মেয়ে এসে গেছে।দেখ তো মা, এটা কেমন। কিনলাম মাত্র কুড়ি টাকা দিয়ে।
তরুন কথাটা বলে মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে যে জিনিসটা দিল। সেটা একটা পাতলা গেঞ্জির কাপড়ের গোল করে সেলাই করা ব্যান্ডের মতো।
-ওটা দিয়ে আর যাই হোক ঠান্ডা আটকাবে না।এর চেয়ে তো একটা টুপি কিনতে পারতে,একটু টাকা বেশি খরচ করে।বনানীর মা বলতে লাগলো।
-টুপির কতো দাম জানো। আমার মতো অটোওয়ালার এই ঠিক আছে।।ভোরের দিকে একটু কানে হাওয়া লাগে তাই।
-এভাবেই তো ঠান্ডা লেগে যাবে। নিজের জন্য তো একটা সুতোও কেনোনা। সেই কবেকার সোয়েটার টা,ছিঁড়ে গেছে তবু ওই পড়ে যাচ্ছো।
-ধুর ধুর। কি হবে কিনে। সারাদিন তো অটো চালিয়েই কেটে যায়। এইটা এখনো বছর দুয়েক যাবে। বছরে তো মাত্র এই দু'মাস। সামনে মেয়েটার মাধ্যমিক,ওকে পড়ানোর জন্য টাকা জমাতে হবেনা??আমার এই ভালো। সস্তায় পুষ্টিকর।কিরে মা ভালো হয়নি??
এতক্ষণ বনানী মা-বাবার কথা শুনছিলো হাতে করে নেড়ে চেড়ে জিনিসটা দেখে এবার মাথা নাড়লো। মা ও আর কথা বাড়ালো না, গজগজ করতে করতে রান্না করতে চলে গেল।
বছর পনেরোর বনানী মুখে কিছু বলল না কারণ সে বেশ বুঝে গেছে,তাদের সংসারে আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি। নিম্নবিত্ত পরিবার তাদের কোনরকমে দিন চলে, তবু বাবা তার কোন অভাব রাখেনি। তার স্কুলের পেন, খাতা যখন যা লেগেছে সব এনে হাজির করেছে। সেটা হাজির করতে গিয়ে হয়তো শুধু নিজের শখ নয়, নিজের অতি প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে পর্যন্ত হাসিমুখে ত্যাগ করেছে। কদিন পরেই বড়দিন, তাদের ছোট্ট শহর জুড়েও উৎসবের মেজাজ। সেটা ভাবতেই মনে হলো, তাদের সংসারে, বাবাই হলো আসল স্যান্টাক্লজ যে হাসিমুখে সবার জন্য করে যাচ্ছে, সারাবছর সবাইকে শুধু দিয়ে যাচ্ছে। এই বাবাদের জন্যেও তো কখনো কখনো স্যান্টাক্লজ কিছু দিতে পারে, মনে হলো বনানীর ।
পরের দিন স্কুলে ওয়ার্ক এডুকেশন ক্লাসে, স্কুলের কাজ হিসেবে করা, বনানীর বোনা মোজা গুলো দেখে ওর বন্ধু রীতা বলে উঠলো-
-ও মা তুই কি সুন্দর মোজা বানিয়েছিস, আমাকেও প্লিজ বুনে দে না। সেলাই খাতাতে জমা করতে হবে।
রীতার বাবার উলের ব্যবসা সেটা জেনেই, বনানী একটু ভেবে বলল
-আমি বুনে দেব কিন্তু তার বদলে আমাকে চার গোলা আরো উল এনে দিতে পারবি?? আমার কাছে পয়সা থাকলে আমিই কিনে নিতাম। কিন্তু...
- আরে এ আর এমন কি ব্যাপার আমি কালকেই তোকে এনে দেবো।
আনন্দে রীতাকে জড়িয়ে ধরে বনানী বলল 'তুই আমার আর একটা সান্তা।'
রাত জেগে, রীতার দেওয়া উলগুলো দিয়ে নিজে হাতে বুনে তৈরি করল বাবার জন্য একটা নতুন কান ঢাকা টুপি।।
বনানী ভেবে রেখেছিল, বড়দিনের দিন বাবাকে ওই টুপিটা উপহার দেবে। আসলে তো স্যান্টাক্লজ লুকিয়ে থাকে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই। কিন্তু সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখল, বাবা তার আগে বেরিয়ে গেছে অটো চালাতে। সারাদিন ধরে অপেক্ষা করতে লাগল কিশোরী বনানী । অবশেষে রাতে প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ বাবা ফিরলো বাড়িতে।
তাকে দেখেই বাবার কাছে ছুটে হাসিমুখে এগিয়ে গেল বনানী । তরুন তাড়াতাড়ি ঝোলার মধ্যে থেকে একটা কেক বার করে মেয়ের হাতে দিয়ে বলল-
-আমি জানতাম তুই ঘুমাবি না। বড়দিনের দিন,কেক না খেলে চলে, বল। এই নে মা,একটু দেরি হয়ে গেল।।
একহাতে কেকটা নিয়ে হাসিমুখে বাবার হাতে ধরিয়ে দিলো নতুন বোনা সবুজ-সাদা টুপিটা।
-এটা তোমার জন্য, পড়ে দেখো কেমন হয়েছে?? আমি নিজে হাতে বানিয়েছি। এটা পরলে, আর তোমার ঠাণ্ডা লাগবে না বাবা।
তরুন আর কোন কথা বলতে পারল না, এ যেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ পাওয়া। খুব শীতের মধ্যেও ভালোবাসার উষ্ণতায় তার হৃদয় ভরে উঠলো। এই পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে, এই প্রথম বড়দিনে কেউ তাকে উপহার দিল। বুকে জড়িয়ে ধরল তার জীবনের প্রথম সান্টা কে। দুজনের দুচোখ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে আনন্দাশ্রু ধারা।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন