ভালোবাসার প্যাঁচ - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

স্টেশন ভর্তি লোকের মাঝে রিম্পার এই অদ্ভুত ব্যবহার দেখে, লজ্জায় আমার মাথা যাবার জোগাড়।এই মেয়েটা কি পাগল নাকি ? এমন পাগলামো কেউ করে নাকি? আমি ভেবে পাই না এই মেয়েটার মনে কি চলে ! এতোটা সিনেম্যাটিক হলে কি চলে নাকি ?
আমি  রিম্পাকে বললাম,
-কি করছো তুমি ? এভাবে কেউ জড়িয়ে ধরে ? তাও আবার সবার সামনে ?
রিম্পাতো আমাকে ছাড়লোই না বরং আরো একটু জোরে জড়িয়ে ধরলো । বলল,
-জানো এই কয় দিনে তোমাকে আমি কি পরিমান মিস করেছি ? আর তুমি তো মজা করে বেরিয়েছ !
-আরে বাবা ঘুরতে  গিয়েছিলাম । মাত্র তিন দিনের জন্য ! তোমাকে তো বলেছিলাম, নাকি ? এখন একটু ছাড়ো ! মানুষ জন কি ভাবছে ?
আসলে মানুষ জন কি ভাবছে সেটা নিয়ে আমি খুব একটা ভাবছি না আমি ভাবছি অলিকে নিয়ে । ও যখন দেখবে যে রিম্পা আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরে রেখেছে ও কি ভাববে !!
আমাদের গ্রুপ থেকে ট্যুরে গিয়েছিলাম শিলিগুড়ি । তিন দিনের জন্য ! আজ মাত্র ফিরলাম । আমি ভাবি নি রিম্পা আমাকে রিসিভ করার জন্য ষ্টেশনে এসে হাজির হবে । আমি ট্রেন থেকে নেমেছি ওমনি এসে আমাকে সোজাসুজি জড়িয়ে ধরলো । এই মেয়েটা এতো সিনেমা দেখে ! দিনের মধ্য কমপক্ষে একশ বার ফোন করতো তবুও রিম্পার মন ভরতো না । আমি তো ভাবতেই পারি নি ও এখানে চলে আসবে ।
রিম্পা যখন আমাকে ছাড়লো আমার সব বন্ধুরা চলে এসেছে ! রিম্পা একটু সরে দাঁড়ালো । ঠিক তখনই আমি অলিকে দেখতে পেলাম । সুবীরের পেছনে দাড়িয়ে আছে । ওর মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে আমাকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্যটা ও দেখেছে ! আর এটাও খুব স্পষ্ট যে ব্যাপারটা ও একদম পছন্দ করে নি ।
অলি আর আমার সাথে কথাই বলল না । গম্ভীর হয়েই দাড়িয়ে রইলো সুবীরের পেছনে । আমি কিছু বললাম না । না জানি কি সিন ক্রিয়েট করে ফেলে !!
এই মেয়ে গুলো এতো কনফিউজিং ক্যারেক্টার কখন কি যে করে বোঝাই মুশকিল !! পুরো ট্রিপ জুড়ে অলি আমার পেছন একটুও ছাড়ে নি আর রিম্পাকে দেখে আমাকে যেন চিনছেই না !
আজব !!
রিম্পাকে বাসায় পৌছে দিতে দিতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল । রুমে পৌছাবো ঠিক এই সময়ে অলির ফোন !
-কোথায় তুই ?
-এই তো ! রুমে ঢুকবো !
-একটু ?আয় তো !
-এখন ? মাত্র রুমে ঢুকবো! -এখনও ঢুকিস নিতো ! আসতে বলছি আয় ! তোমার পুঁচকে গার্লফ্রেন্ড বললে তো ঠিকই চলে যেতে !
-আচ্ছা বাবা আসছি ! কোথায় আসবো !

অলির কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে রাত হয়ে গেল । ওদের বাসার পাশের গলিতে দাড়িয়ে ছিল আমার জন্য !
-বল ! কি জন্য ডাকলি !
অলিদের এই গলিটা মোটামুটি নির্জনই বলা চলে ! আসলে ভিআইপি এলাকা তো । যে কেউ আসতে পারে না ।
অলি কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষন । ওর মুখটা বেশ গম্ভীর মনে হল
-কি ব্যাপার ? এতো গম্ভীর কেন ?
-তোর গার্লফ্রেন্ড এমন করলো কেন ?
-কেমন?
-কেমন মানে ? একে বারে যেন বাংলা সিনেমা । তুমি নায়ক সে নায়িকা !
-আরে এতো গম্ভীর কেন রে তুই ? কি হয়েছে তাতে ? ও তো একটু এমনই !
অলি আমার দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন ।
বলল, -তুই ওকে কবে বলবি? -কি বলবো ?
-কি বলবি বুঝতে পারছিস না ?
আমি অলির মুখ দেখে খানিকটা চিন্তিত হলাম ।
ঐদিনকার ঐ ঘটনা কে অলি কি তাহলে খুব সিরিয়াসলী নিয়েছে ?
কি এক ঝামেলায় পড়লাম ।
অলি এগিয়ে এসে আমার হাত টা ধরে বলল,
-দেখ, আমি একটা ভুল করেছিলাম তাই আমি কষ্ট পাচ্ছি । মেনেও নিয়েছিলাম । কিন্তু এখন আমি আর তা মানবো না । কিছুতেই না ।
-অলি,তুই কি বলছিস এসব ? তোর মাথা ঠিক আছে তো ? দেখ ঐদিন যা হয়েছে তা ইচ্ছে করে হয় নি । এটা যেমন তুই জানিস আমিও জানি !
এই কথা শোনার পর শোনার পর অলির কি হল ঠিক বলতে পারবো না তবে ও সরাসরি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো ! আমি বুঝতেই পারি নি যে ও এমনটা করবে ! তবে ভাগ্য ভালো যে আশে পাশে কেউ নাই ! এমনিতেই অন্ধকার হয়ে এসেছে !
-এই কি করছিস তুই ? ছাড় ! ছাড় বলছি ।
অলির আমার কথা খুব একটা কানে গেল বলে মনে হল না । আমাকে চুমু খাবার জন্য আর একটু এগিয়ে এল । আমি এবার জোর করেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম । বললাম
-কি করছিস তুই ?
-কেন ? এখন ভাল লাগছে না ? ঐদিন আমার ঠোট তোর কাছে খুব মিষ্টি লেগেছিল । এখন নিজের গার্লফ্রেন্ড কে পেয়ে আমার কথা ভুলে গেলি ।
তারপর অলি বেশ কিছু খারাপ কথা বলল !
আমি চুপ চাপ শুনলাম কেবল !
কথা শেষে বললাম, -তোর মাথা এখন গরম । মাথা ঠান্ডা কর ! আমি যাই ! -খবরদার বলছি যাবি না ! -আমি যাই ।
আমি আর দাঁড়ালাম না । পিছন ঘুরে হাঁটা দিলাম ।
অলির মাথা এমনিতেই খারাপ । এখানে থাকলে আরও কি হবে কে জানে !!
আমার কেন জানি মনে হচ্ছে ঐদিন অলি ইচ্ছা করেই কাজ টা করেছিল !
অন্ধকার পথে হাটতে হাটতে রিম্পার মুখটা ভেসে উঠল । ওর কথা মনে হতেই মনের একটা আনন্দ অনুভব করলাম । মেয়েটা এমন পাগলামো করে মাঝে মাঝে ।
একবার কি মনে হল আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজবে । তাও আবার রিক্সায় চড়ে । আকাশে মেঘ হলে আমাকে ফোন করত। আমরা কত ঘুরেছি বৃষ্টির অপেক্ষায় কিন্তু বৃষ্টির দেখা মেলে নি ।
কিন্তু শিলিগুড়ি যাওয়ার আগে একদিন আমি আর অলি রিক্সায় করে সুপার মার্কেটে যাচ্ছিলাম বলা নেই কওয়া নেই হুড়মুড় করে বৃষ্টি নেমে গেল । আমি হুট তুলতে যাবো অলি কিছুতেই তুলতে দিল না । আমার দিকে তাকিয়ে খুব হাসতে লাগলো । তারপর বলল,
-দেখছিস উপরওয়ালাও চায় না তুই রিম্পার সাথে বৃষ্টিতে ভিজিস !
পরে রিম্পা খুবই মন খারাপ করেছিল । আমি বলতে চাই নি অলিকে । অলি নিজেই রিম্পাকে ফোন করে বলেছে । কি বলেছিল কে জানে কিন্তু পর যখন রিম্পার মন খুব খারাপ ছিল ।
কি বলেছিল সেটা দুজনের কেউই আমাকে বলেনি কিন্তু নিশ্চয়ই কিছু একটা বলেছিল যেটাতে রিম্পার মন খুব খারাপ ছিল ।
আমি কারন জানতে চাইলেও রিম্পা কোন জবাব দিল না।
অনেক্ষন পর মুখ গোমড়া করে বলল, -জানো অপু, আমার মাঝে মাঝে খুব ভয় হয় !
-কেন কিসের ভয় !
-আমার মনে হয় তোমাকে আমি হারিয়ে ফেলবো ।
-এমন কথা কেন বলছো ?
রিম্পা কোন জবাব দিলো না । মন খারাপ করেই রইলো !
আমি বুঝলাম অলি আসলে এমন কিছু বলেছে !
আমি অলির কাছে জানতে চাইলাম । কিন্তু ও কোন কথাই বলল না
-তুই রিম্পাকে কি বলেছিস রে ?
অলি কিছু না বলে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর হাসতে লাগলো ।
-তোর  পুঁচকে গার্ল ফ্রেন্ড কি খুব কান্নাকাটি  করছিল ?
-দেখ ! মজা করিস না । সিরিয়াসলি বল ! কি বলেছিস ?
-বলব না । কি করবি !
আমি কিছু বলতে পারি না । এই মেয়েটার মনে কি চলছে ? কে জানে ?
অলি আবার বলল,
-তুই ভাবিস না তোকে আমি এমনিতেই ছেড়ে দেবো? কিছুতেই ছাড়বো না । দেখি তোর পুঁচকে গার্ল ফ্রেন্ডের ভালবাসায় কত জোর? তোকে আটকয়ে রাখতে পারে কি না?
আমি এবার একটু ভয় পেলাম । অলি এমন কথা কেন বলছে !! আমি এতো দিনে ওকে যতটা চিনেছি তাতে অবশ্য একটু ভয়ের কথাই ! যদি অলি একবার কোন কিছু ঠিক করে ফেলে তাহলে সেটা ও করেই ছাড়বে ! যে কোন কিছুর বিনিময়েই হোক !
আমি খানিকটা টেনশন ফিল করলাম । আচ্ছা অলি সব কিছু বলেছে নাকি রিম্পাকে ! তাহলে তো সমস্যা হবে । মেয়েটা যা ইমোশনাল এসব কথা শুনে আবার কিছু করে না ফেলে ।
আমি পড়েছি এক ঝামেলায় । এই মেয়ে গুলো এমন ঝামেলা তৈরি করে না ! রাতের বেলা রিম্পার ফোন । অনেক রাত্রে ! ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি প্রায় তিনটা বাজে । এতো রাতে কেন ফোন দিল ।
কোন সমস্যা হল নাকি ?
আমি একটু টেনশন নিয়েই ফোনটা ধরলাম ।
রিম্পা চুপ করে রইলো । কোন কথা বলল না প্রথমে !
-কি হল কথা বলবে না ?
আমি শুরু করলাম !
আরো কিছুক্ষন নীরবতা । তারপর
-তুমি কি অলি দিদিকে ভালবাস?
-মানে ?
-সত্যি কথা বলবে ? আমার সাথে রিলেশনের আগে তুমি কি তাকে ভালবাসতে ?
-কি বলছো এসব ? কে বলল তোমাকে এই কথা ? অলি বলেছে ?
-যেই বলেছে ! কথাটা সত্যি কি না বল ।
আমি একটু সময় নিলাম । তারপর বললাম
-হ্যাঁ,কথাটা সত্যি ! আমি ওকে প্রপোজ করেছিলাম । কিন্তু ও আমাকে রিফিউজ করেছিল !
কথাটা আসলেই সত্যি । রিম্পা আমার প্রথম ভালবাসা না । ইউনিভার্সিটির প্রথম দিকে অলির প্রতি বেশ দুর্বল হয়ে গিয়েছিলাম । প্রপোজ করেছিলাম । কিন্তু অলি সেটা গ্রহন করে নি । কেন করে নি কে জানে !!
কিন্তু আমাদের বন্ধুত্বে তেমন কোন একটা প্রভাব পড়ে নি । আমি যাতে ওর সামনে অপ্রস্তুত না হয়ে পড়ি সে কারনে ও নিজেই আমার দিকে বেশি এগিয়ে এসেছিল । আমাকে বুঝিয়েছিল যে এই সব প্রেম ভালবাসা তার জন্য না । এটার জন্য আমাদের বন্ধুত্ব যেন নষ্ট না হয় ! তারপর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায় !
তারও কিছুদিন পর আমার রিম্পার সাথে পরিচয় হয় ! সেখান থেকেই ওকে ভাল লাগে । তারপর ওর সাথেই আছি । কিন্তু আমার একটা ভুল হয়ে গেছে যে রিম্পাকে আমার এই কথাটা না বলা । বললে আজ হয়তো এই কথাটা বলতে পারতো না । আমি বুঝতে পারছি এর পরের কথা কি বলবে ? রিম্পা বলবে আমাকে এতদিন বল নি কেন এই কথা ?
কিন্তু রিম্পা এই প্রশ্নটা করলো না । আমাকে বলল
-এখনও কি ভালবাস ওকে ?
-মানে ? না ! দেখো একটা সময় ছিল যে ওকে পছন্দ করতাম কিন্তু তুমি আসার পর থেকে আমি আর ভাবিও নি । ও আমার কেবলই বন্ধু !!
-আচ্ছা বন্ধু ?? তাহলে শিলিগুড়ি গিয়ে ওকে চুমু  খেয়েছ কেন ?
-মানে ????
আমি আকাশ থেকে পড়লাম । অলি এই কথা যে ওকে বলে দেবে আমি ভাবতেই পারি নি !
-এখনও কি বলবে যে তুমি ওর কেবল বন্ধু !
-দেখ ব্যপারটা এই রকম না । পরিস্থিতিটা এমন ছিল যে ….।
আমি ঠিক বোঝাতে পারছিলাম না ঠিক কিভাবে বোঝাবো ওকে !
-দেখ অপু আমি কিন্তু অতটা কচি খুকি না যে তুমি আমাকে যা বলবে বা আমি তাই বুঝবো !!
-দেখ ব্যাপারটা ঐ রকম না !
-আমি কিছু শুনতে চাচ্ছি না যে ব্যাপারটা কি রকম । আমি কেবল জানতে চাই তুমি অলিকে চুমু  খেয়েছ কিনা ? আর কোন কথা না !
-হ্যাঁ । কিন্তু………..।
আমার কথা শেষ হবার আগেই রিম্পা ফোন রেখে দিল ।
অলির উপর মেজাজটা খুব খারাপ হল ! মেয়েটা এমন কেন করলো ? কেন ?
একটা সময় ছিল অলি নিজেই আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ।
ওর ভাষ্য অনুযায়ী প্রেম ভালবাসা ওর জন্য না আর এখন ও নিজের আমাদের মধ্যে এমন প্যাঁচ লাগিয়ে দিল ।
আমি বেশ কিছুদিন ধরেই ব্যাপারটা খেয়াল করছিলাম । অলির মধ্যে কেমন একটা যেন পরিবর্তন এসেছে । বিশেষ করে আমাকে যখন রিম্পার সাথে দেখতো অথবা যখন আমি রিম্পার সাথে ফোনে কথা বলতাম ওর মুখ কেমন যেন গম্ভীর হয়ে যেত !
তারপর কেমন একটা ভার ভার করে থাকতো ! আমার সাথে ঠিক কথাও বলতো না কিছ সময় !চোখে মুখে ঈর্ষার ছাপ পরিষ্কার ফুটে উঠত। আসলে এটা একটা অহং বোধের  পরাজয়ের মানসিক বেদনার ফল।মনে হয় সেই কারণে আমাদের মধ্যে লাগিয়ে দিল এই ভালোবাসার প্যাঁচ। স্টেশনে  রিম্পার অস্বাভাবিক ব্যবহারের কারণ  এখন  আমার বোধগম্য হল,যদিও আমি নিশ্চিত শেষ অবধি ভালোবাসার জয় হবেই, এটাই চিরন্তন সত্য।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।