অবশেষে প্রেম-পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

মনীষীর উক্তি আছে,-  "যে ভালোবাসতে জানে , ভালোবাসি বলতে জানে না, তার মতো অভাগা এ পৃথিবীতে নেই।" এটা সত্যিই একটা নির্মম সত্য। যতই লজ্জা - সংকোচ পথে বাঁধা হয়ে উঠুক - তবুও সত্যকে প্রকাশ করা উচিত। ক্ষণস্থায়ী এই মানব জীবনের  কোন ভরসা  নেই - হয়ত ভালোবাসা না বলা থেকেই যেতে পারে কিছু হৃদয়ের।
আশা এবং  বিপুল দুজনে ভীষণ বন্ধুত্ব, শুধুই কী বন্ধুত্ব না তার থেকে বেশী অন্যকিছু?
– তুই আমাকে এখনো ভালোবাসিস ?
– না।
– কেন ?
– কেন আবার কি ?
– ভালোবাসিস না কেন ?
– যখন ভালোবেসে ছিলাম তখন তো মূল্য দিলি না।
– তুই তো আমাকে বলিসনি  কোন দিন ?
– তোর বোঝা উচিত ছিলো।
– তুই না বললে কেমন করে বুঝবো ???
– কেমন করে বলব ? বলার আগেই তো তুই ওই ছেলেটাকে আমাদের মাঝে নিয়ে আসলি।
– ও আমার জাষ্ট ফেন্ড ছিলো আর কিছু না।
– আমি তো তোর বেষ্ট ফেন্ড ছিলাম। মাএ দুই দিনের একটা ছেলের জন্য তুই আমাকে ভুলে গেলি ?
– আমি তোকে ভুলিনি , তুই আমার কাছ থেকে দূরে চলে গেছিস।
– কেন গেছি তু্ই জানিস না ?
– না।
– জানবি কেমন করে ? আমি তো তোর কেউ ছিলাম না।
– এমন ভাবে বলিস কেন ? তু্ই তো জানিসই আমি একটু কম বুঝি । বললেই পারিস।
– আমি তোর পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারি না।
– একবার বললেই পারতি!!
– কেন বলব ? তুই বুঝিতে পারিস না ?
– বুঝলে কি আর তোর থেকে দূরে থাকতাম।
দুজনেই চুপ। কিছুটা সময় নীরবতার পর আশা বলে উঠল, 

– চুপ কেন ?
– এমনিই।
– কাউকে ভালোবাসিস ?
– না।
– ভালোবাসতি ?
– হ্যাঁ ।
– সেদিন বলিসনি  কেন ?
– বলার সাহস ছিলো না।
– কেন ?
– তোকে হারানোর ভয়ে।
– কেন হারাবি আমায় ?
– তোকে বলার পর যদি তুই “না” বলে দিস। যদি তুই চলে যাস আর আমাদের বন্ধুত্বটা নষ্ট করে দিস।
– তুই কেমন করে ভাবলি “তোকে ছেড়ে আমি চলে যাবো ?”
– তাহলে এই দুই বছর কোথায় ছিলি ?
– ওটা তো……………….!!! থাক পুরানো কথা বাদ দে।
– ok, দিলাম।

আবারও নীরবতা দুজনের মাঝে। প্রকৃতিটাও কেমন যেন ওদের সাথে শান্ত হয়ে গেল । মনে হচ্ছে আকাশেরও বুঝি আজ মন খারাপ। এই বুঝি কান্না শুরু করবে।
– কিছু বলবি ?
– কি বলবো ?
– যা ভাবছিস এখন।
– তুই বলতে পারিস না ?
– না।
– কেন ?
– তুই জানিস না, “মেয়েদের বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না”।
– কেন ফাটে না ? তোরা ফাটাতে চাসনা দেখেই ফাটে না।
– হা……..হা……..হা……..হা……..!!!
– তোর হাসিটা এখনো আগের মতোই সুন্দর। (আশার দিকে তাকিয়ে বিপুল )
– যাক বাবা, আমার হাসির কারণে হলেও তুই একবারের জন্য আমার দিকে তাকালি। এতক্ষণ তো আমার মনে হয়েছিলো আমি কোন রোবটের সাথে কথা বলছি।
– (চুপ)
– আচ্ছা আমি আসি (আশা উঠতে যাবে ঠিক তখনি আশার হাত ধরে ফেলল বিপুল )
– বস।
– কেন বসবো ? তুই তো কিছু বলবি না !!!
– বস বলছি।
– বল, কি বলবি ?
– আমার হাতটা একটু শক্ত করে ধরবি ?
– হুম ধরলাম।
– ছোটবেলায় তোকে হরলিক্স খাওয়ায়নি ?
– কেন ? (বিস্মিত হয়ে)
– তোকে শক্ত করে ধরতে বলছি , স্পর্শ করতে বলিনি ।
– ok বাবা, ধরলাম। এবার বল কি বলবি ?
– আশা , আমি…….
– হুম….!!
– আমি……
– তারপর ?
– তোকে…
– হুম…..!!
– তোকে…
– তোকে কি …..??
– আমি একটু জল খাবো, একটু জল দে…। (হতবিহ্বল হয়ে পড়লো বিপুল )
– (হাত ছেড়ে দিয়ে রাগান্বিত হয়ে) যা ওই দোকান থেকে খেয়ে আয়।
– তোর কাছে নেই ?
– না।বিপুল উঠে জল খেতে চলে গেল। এমন ভাবে গেল মনে হয় কত বছরের তৃষ্ণার্ত । অপর দিকে আশার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আজ দুই বছর পর ওদের দেখা অথচ বিপুল ওর মনের কথাটা আজও বলতে পারলো না। আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এই দিনে আশার সাথে বিপুলের প্রথম পরিচয় হয়। বন্ধুত্বের কিছুদিন পরেই আশাকে ভালোবাসতে শুরু করে বিপুল । আশাও ব্যাপারটা বুঝতে পারে কিন্তু না বুঝার ভান করে থাকে। মেয়েদের এই এক স্বভাব, “বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না”। ওই দিকে বিপুল নানা কথা-বার্তায়, চাল-চলনে আশাকে বুঝাতে চেষ্টা করে যে সে আশাকে ভালোবাসে। আশা বুঝেও সবসময় না বুঝার ভান করে থাকতো। কারণ, আশা সবসময় চাইতো বিপুল আশাকে সরাসরি প্রপোজ করুক। সব মেয়েরই এই রকম স্বপ্ন থাকে যে তার ভালোবাসার মানুষ তাকে আগে প্রপোজ করুবে, তার মনের কথাটা বলবে কিন্তু বিপুল সেটা পারছে না শুধুমাএ বন্ধুত্বটা নষ্ট হওয়ার ভয়ে। কোনদিন আর পারেও নি । মাঝে অন্য একটা ছেলের জন্য দুই জনের বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। অতঃপর দীর্ঘ দুই বছর পর আজ আবার তাদের দেখা কিন্তু বিপুল আজও আশাকে মনের কথা না বলায় আশার মন খারাপ।
৩০ মিনিট হয়ে গেল বিপুল এখনো আসছে না। আশা ফোন করলো কিন্তু বিপুল ফোনটাও ধরছে না। হয়তো বিপুল চলে গেছে, হয়তো বিপুলের আজও বলার সাহস হয়নি এমনটা ভেবে আশা উঠে দাঁড়ালো । হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন “আশা” বলে চিৎকার দিয়ে উঠল। আশা পিছনে ফিরে তাকালো। আরে এতো বিপুল! ও একটু দূরে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, হাতে এক গুচ্ছ লাল গোলাপ। বিপুল লাল গোলাপ গুলো আশার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল,– আশা……, I……Love……You……..!!!
শান্ত লেকের পাড়টা যেন বিপুলের চিৎকারে  কেঁপে উঠল। লেকের পাড়ের উৎসুক মানুষ গুলোর দৃষ্টি এখন শুধু বিপুল আর আশার দিকে। এমন দৃশ্য হয়তো আজ বিরল তাই কেউ কেউ ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। অন্য দিকে আশা অপলক দৃষ্টিতে বিপুলের দিকে তাকিয়ে রইল। যে বিপুল ভালোবাসি কথাটা বলতে তিন বছর সময় নিলো, যে বিপুল মনের কথাটা বলতে গেলে হাত  কাঁপতে শুরু করে সেই বিপুল আজ পুরো পৃথিবীর সামনে প্রপোজ করল। এটা ভাবতেই আশা অবাক হয়ে গেল। আশা কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। আশার বিস্ময় যেনো কাটছে না। বিপুল সত্যি আজ প্রপোজ করল নাকি আশা স্বপ্ন দেখছে। কেন যেন আজ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না আশা । সব কিছুই যেন আজ স্বপ্ন মনে হচ্ছে। এই সব কথা ভাবতে ভাবতে আশার চোখে জল চলে আসল।– কিরে আর কতক্ষণ বসে থাকবো ??বিপুলের কথায় যেন জ্ঞান ফিরল আশার । আশা আস্তে আস্তে বিপুলের দিকে এগিয়ে আসলো। বিপুলের হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিলো। বিপুল উঠে দাড়ালো। আশা বিপুলের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর_________– কিরে, কিছু বলবি না ?
– কি বলবো ? (আশার চোখে জল )
– তুই কাঁদছিস কেন ?
– মার খাবি। এই কথাটা বলতে এত সময় লাগলো ???
– ওকে, সরি…..।
– কানে ধর।
– কার ? তোর না আমার ?
– তোর, শয়তান। (ধমক দিয়েই বলল আশা )
বিপুল কান ধরতে যাবে ঠিক তখনি আশা “I Love You Too” বলে বিপলুকে জড়িয়ে ধরল। আশার চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। বিপুল জানে আশার চোখে আজ কোন কষ্টের কান্না ছিলো না, যা ছিলো তা ছিলো আনন্দের। আর বিপুলের চোখে-মুখে ছিলো আনন্দের হাসি। গত দুই বছর বিপুল আশার জন্য অনেক কেঁদেছে, সেই কান্না আজ হাসিতে রুপান্তরিত হয়েছে।
নীতিকথা : সত্যিকারের ভালোবাসায় যতই ফাটল ধরুক না কেন, একদিন না একদিন মিলন ঠিকই হয়______।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।