যুযুৎসু - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
সাধারণ মানুষের মুখে ঘোরা একটি পরিচিত কথা - যুযুৎসুর প্যাঁচ। খুব শোনা এই কথাটি। আসলে যুযুৎসু ছিলেন দ্বন্ধযুদ্ধ পারদর্শী।
কুস্তির বিভিন্ন প্যাঁচের মত এক প্যাঁচ হল যুযুৎসুর প্যাঁচ। এই প্যাঁচে যদি কাউকে ধরা হত তার ছাড়া পাওয়া মুশকিল। এই প্যাঁচের কায়দাটা যুযুৎসুর নিজের আবিস্কার করা যুদ্ধরীতি।এই যুযুৎসুর প্যাঁচ বর্তমান যুগেও বহু প্রচলিত এক কায়দা যা আজও প্রচলিত।
পরিচয়:
*********
যুযুৎসু ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের সন্তান। আর ছিলেন কৌরবকুলের সবচেয়ে বড়। তবে এনার মাতা নন গান্ধারী। আসল মাতা ছিলেন গান্ধারীর দাসী সুগ্ধা।
কৌরব জন্মকথন:
******************
গান্ধারীর প্রথমদিকে হয়নি সন্তান।
বেদব্যাস আসেন ওনাদের প্রাসাদে। গান্ধারীর অক্লান্ত সেবায় তুষ্ট হন বেদব্যাস। বিদায়কালে গান্ধারী প্রণাম করলে উনি বলেন - আয়ুষ্মান ভবঃ শত পুত্রবতী হও। তখন গান্ধারী তার পায়ে পড়ে যান- বলেন তবে তাই হোক। আপনার কথা ফলে যাক, আমি শত পুত্রের জননী হতে চাই।
বেদব্যাস তখন বলেন একশত দেবতার নাম নিতে যার তেজে গান্ধারী পাবেন একশত সন্তান।
পতিব্রতা গান্ধারী চান ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে যেন তার সন্তান হয়। সম্মতি ও আশীর্বাদ দিয়ে বিদায় নেন বেদব্যাস।
এরপরে গান্ধারী হয়ে যান সন্তানসম্ভবা। দিন দিন গান্ধারীর গর্ভ বড় হতে থাকে। ওনার চলাফেরা একরকমের বন্ধ হয়ে যায়। দুঃসহ ব্যথা নিয়েও উনি সন্তানের জন্মদেবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকেন।
এদিকে কুন্তীদেবী প্রথম সন্তানের জন্ম দিলে খুব হতাশ হন গান্ধারী। গান্ধারী চেয়েছিলেন তার সন্তান হোক সর্ব জ্যেষ্ঠ। তাই এই খবর শুনে উৎকন্ঠায় তার গর্ভনাশ হয়। জন্ম দেন এক বিশাল মাংসপিণ্ডের।
বেদব্যাসকে খবর পাঠানো হলে তিনি আসেন। তিনি এসে বিশেষ রকমের কুম্ভ অর্থাৎ হাঁড়ি তৈরি করতে বলেন কিছু ঔষধ সহকারে।
এরপর মাংসপিন্ডটিকে একশত টুকরো করার জন্য বলেন। কিন্তু ভুল বশত সেটি একশত এক টুকরো কাটা হয়। তখন তড়িঘড়ি আরেকটি হাঁড়ি তৈরি করে একশত এক মাংস টুকরো সেই হাঁড়ি গুলিতে রেখে দেওয়া হয়।
এরপরে আরো নয়মাস পরে সেগুলো থেকে একে একে সন্তানের জন্ম হয়।
প্রথম সন্তান ছিলেন #দুর্যোধন। কিন্তু দুর্যোধনের জন্মের সাথে সাথে শুরু হয় বিভিন্ন অমঙ্গলের সূচনা। যেমন গাধা কাক শকুনের ডাকাডাকি শুরু হয় চরম মাত্রায়। দিনের বেলা অন্ধকার নেমে আসে। রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে বজ্রপাতে মৃত্যু, আগুন লাগা, ফসল নষ্ট ইত্যাদি খবর আসতে শুরু করে।
তখন রাজমাতা সত্যবতী শিশু দুর্যোধনকে গঙ্গায় নিক্ষেপের নির্ণয় নেন কিন্তু রাজি হন না ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী।
এরপরে একে একে সেই কুম্ভ থেকে জন্ম নেন একশত পুত্র আর একটি কন্যা সন্তান নাম দুঃশলা।
এদিকে দুর্যোধনের জন্মের কিছুক্ষন মধ্যেই জন্ম নেন কুন্তীর আরেক সন্তান ভীম আর দাসী সুগ্ধার সন্তান যুযুৎসু।
সেই হিসেবে দুর্যোধন ভীম যুযুৎসু এরা মোটামুটি একই বয়সী।
গান্ধারী যখন প্রায় দুই বছর সন্তান ধারণে ব্যস্ত ছিলেন সেই সময়ে দাসী সুগ্ধা ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের সেবায় নিযুক্ত। ধৃতরাষ্ট্র ঔরসে তখন সন্তান সম্ভবা হন সুগ্ধা।
আসলে কৌরবকূল একশত এক নয় একশত দুই।
তবে দাসিপুত্র হলেও #যুযুৎসু কিন্তু আর সবার সাথেই একইভাবে বড় হয়ে উঠেছিলেন। পুঁথি অস্ত্র ইত্যাদি সমস্ত শিক্ষা তিনিও লাভ করেছিলেন অন্যান্য ভাইদের মতোই।
কৈশোর:
**********
তবে দুর্যোধনের শয়তানি হিংসুটে মনোভাব তার ভালো লাগতো না। তাই তিনি পাণ্ডব পক্ষের সাথেই সখ্যতা বেশি রাখতেন।
এরফলে দুর্যোধনের বিভিন্ন ক্ষতিকর ষড়যন্ত্র তিনি পাণ্ডবদের কানে তুলে দিয়ে তিনি বহুবার সতর্ক করে দিয়েছেন। একবার ভীমকে বিষ খাওয়ানোর ষড়যন্ত্র করেছিলেন দুর্যোধন। তখন যুযুৎসুর সাবধানবানীতে ভীম বেঁচে যান।
দুর্যোধনের বুঝতে সময় লাগেনি এই ব্যাপারটা। তাই পরেরবার তিনি যুযুৎসুকে বাদ দিয়েই করেন ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের মূল কারিগর ছিলেন মামা শকুনি। তিনি নিয়ে আসেন তার ঘর গান্ধার থেকে সেখানের এক ভয়ংকর বিষ।
সেই অনুযায়ী ভীমের সাথে আলাপ করেন দুর্যোধন, ভীমের প্রিয় ঘি লাড্ডু খাওয়াতে থাকেন। একদিন সুযোগ বুঝে গান্ধার থেকে আনা সেই ভয়ানক তীব্র বিষ মাখানো পায়েসের সাথে মিশিয়ে খাওয়ান ভীমকে। তারপর হাত পা বেঁধে নদীতে ফেলে দেন। নাগলোকের দেবতা বাসুকির নির্দেশে বিষধর সাপের দল ভীমকে দংশন শুরু করে। কিছুক্ষনের মধ্যে বিষে বিষে বিষ ক্ষয় হয়ে ভীম রক্ষা পান।
এরপরে বাসুকি তাকে অমৃত দেন। সেই অমৃত খেয়ে 100 হাতির শক্তি লাভ করেন ভীম।
বাসুকি ফিরিয়ে আনেন ভীমকে হস্তিনাপুরে।
শিক্ষাগ্রহন:
************
ভীমের মুখে সমস্ত খবর শুনে রাজ পরিবারের নির্ণয় হয় সবাইকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য গুরু দ্রোণের আশ্রমে পাঠান হবে। একসাথে শিক্ষা গ্রহন করলে সমস্ত ভাইদের মধ্যে আন্তরিকতা বাড়বে এই ছিল ভাবনা। সেই অনুযায়ী যখন শিক্ষা নিতে যান কৌরব আর পাণ্ডব ভাই এর দল তখন এদের বয়েস অনেক বেশি ছিল। যুধিষ্ঠিরের বয়েস হয়ে গিয়েছিল প্রায় সতের বছর...।বলা বাহুল্য এই দলে ছিলেন যুযুৎসুও।
কুরুক্ষেত্রে:
***********
কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের শুরুতে যুধিষ্ঠির একবার ঘোষণা করেন- যদি কেউ পাণ্ডব পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতে চান তাহলে আসুন আর যদি কেউ কৌরব পক্ষে যেতে চান তাহলে যেতে পারেন।
শুনে যুযুৎসু চলে আসেন পাণ্ডব পক্ষে।
কারন জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন ন্যায়ের পক্ষে ধর্মের পক্ষে লড়তে চান।
নিজে ছিলেন মহারথী। এই যুদ্ধে তিনি যুধিষ্ঠির আর সহদেবকে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছেন।
যুদ্ধ শেষে যুযুৎসু একমাত্র ব্যক্তি কৌরব পক্ষের যিনি জীবিত ছিলেন। তবে যেহেতু তিনি গান্ধারীর সন্তান ছিলেন না তাই তার কোন করুণা বেঁচে ছিল না যুযুৎসুর জন্য, উপরন্তু পাণ্ডব পক্ষে যুদ্ধ করার জন্য গান্ধারী তাকে চিরকাল দায়ী করেছিলেন।
যুদ্ধ পরবর্তী যুযুৎসুর জীবন:
***************************
এরপরে যদু বংশ নাশ আর শ্রীকৃষ্ণ বলরামের দেহত্যাগের পরে পান্ডবপক্ষ নির্ণয় নেয় এবারে তারাও পৃথিবী ত্যাগ করবেন। এদিকে অভিমন্যু পুত্র পরীক্ষিত তখনও নাবালক।
সেই অনুযায়ী তারা শ্রীকৃষ্ণ পুত্র বজ্র আর যুযুৎসুকে দায়িত্ব দিয়ে যান হস্তিনাপুরের দেখভালের।
যুযুৎসু খুব দায়িত্ব নিয়ে সেই কর্তব্য করেন পালন।
পরে পরীক্ষিত বড় হলে তাকে হস্তিনাপুরের রাজ্যাভিষেক করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।
এরপরে কি হল যুযুৎসুর কিছুই আর জানা যায় না...
তবে যতদিন তিনি হস্তিনাপুরের দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন প্রজারা তাকে "কূলনাশক" বলে অভিহিত করে অপমান করে গেছেন।
কিন্তু যুযুৎসু তার দায়িত্ব থেকে সরে আসেননি।
এমন কি এও শোনা যায় যে গান্ধারী তাকে চিরকাল দায়ী করে গেছেন কৌরবদের সাথে না থাকার জন্য। তিনিও শেষ দিনে যখন বানপ্রস্থের জন্য কুন্তী আর ধৃতরাষ্ট্রের সাথে জঙ্গলে গমন করেন, শেষের সেই দিনেও গান্ধারী মুখ দর্শন করেননি যুযুৎসুর।
কে বলে সত্যের পথ খুব সুগম। কতটা ধৈর্য্য আর অধ্যাবসায় থাকলে এটা সম্ভব হতে পারে সেটা যুযুৎসুর মত মহাবীর তার নিজের জীবনে প্রমান করে দেখিয়েছেন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন