একটি নৈতিক লড়াইয়ের গল্প - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।
মানুষের জীবনটাই একটা বড় গল্প অথবা একটা উপন্যাস। প্রত্যেকটি মানুষের ( জীবিত বা মৃত ) জীবনের আখ্যান যদি একটা গল্প বা উপন্যাস হিসাবে ধরি তাহলে এক / দুইটি জীবনের গল্প একরকম হয়ে উঠতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা হয় না, সামান্য হলেও কিছুটা প্রভেদ থাকে - যেটা সবসময় চিহ্নিত করা যায় না।
আমাদের গল্পগুলো কল্পিত হলেও তার সাথে জীবনের মিল পাওয়া যায় - কিন্তু সেটা অনিচ্ছাকৃত। আসলে সবের মূল উপাদান তো মানব জীবনই।
নিশুতি রাত। বৃষ্টিতে ভিজে ভেজা কাকের মত একাকী পথ চলছে অপর্ণা । কাঁধে একটি ট্রাভেল ব্যাগ। হাওড়ার অদূরে বলাগড় রেল স্টেশনে নেমে স্টেশন মাস্টারের সাহায্য চেয়েছিলো সে। কিন্তু স্টেশন মাস্টার অযথা উপদ্রব ভেবে কোনো কথাই বলেনি তার সাথে। অগত্যা নিজেই ধরেছে নিজের পথ। এরই মধ্যে হঠাৎ শুরু হলো বৃষ্টি, মুষলধারে। পথের কাছাকাছি কোনো বাড়ি নেই যে, একটু আশ্রয় নেবে সে। মাইলখানেক চলার পর হঠাৎ দেখা গেলো অনতিদূরে একটা লণ্ঠনের আলো। বাড়ি হবে হয়তো সেটা। আশার ভেলা বাঁধলো সে। হাঁ যা ভেবেছে তাই , বাড়িই। বিশাল, তবে ভাঙ্গা-চোরা। পরিত্যক্ত প্রাচীন জমিদার বাড়ির মতো। উঠোনে একজন যুবক। হাতে একটা লণ্ঠন। গুনগুন গান গেয়ে ছাতা মাথায় কোলাব্যাঙের মতো হিসি করছে সে। অপর্ণাকে দেখতে পায়নি। লোকটা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে পেছনে ফেরে এবং ভয় পেয়ে যায় অপর্ণাকে দেখে। তোতলাতে থাকে।
আ... আ... আপ.... নি.... কে..কে....?
আমি মানুষ। স্মিত হাসে অপর্ণা। এতো রাতে এই মুষলধারে বৃষ্টি উপেক্ষা করে এতোটা পথ পেরিয়ে এসেছে সে। এতোটুকুও ভয় পায়নি। কিন্তু নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় একজন শক্ত সমর্থ পুরুষের ভয় পাওয়ায় হাসি চেপে রাখতে পারেনি, এতো দুর্যোগেও।
মানুষ আপনি? প্রশ্ন করে যুবক। এই রাত-বিরেতে? কী চাই?
একটু আশ্রয়। সাদামাটা জবাব।
আমি একা থাকি এই বাড়িতে। কোনো মেয়ে-ছেলে নেই। এড়িয়ে যেতে চায় যুবকটি।
আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু আজকের রাতটা থাকবো। ভোর হলে চলে যাবো।
নাছোড়বান্দা। পরী-টরী অথবা মায়াবিনী? ভাবে যুবক। কেন যে মাঝরাতে হিসি করতে বেরিয়েছিলাম! শালা, আজকে কপাল খারাপ। এ মাঝরাতে কোত্থেকে একটা মেয়েছেলে আসবে। না, এ হতেই পারে না। এ কোনো সাধারণ মানুষ নয়, অতিমানবীয় কোনো কিছু হয়তো হবে। একে জায়গা দিলে রাতে টুটি চেপে মেরে ফেলবে। এ ঝড় বৃষ্টির রাতে কোনো ভালো ঘরের মেয়ে বের হতে পারে না।
কী ভাবছেন? তাড়া দিলো অপর্ণা। দেখুন, আমি বড় বিপদে পড়ে আজকের রাতটা কাটাবার জন্যে আশ্রয় চেয়েছি । যদি অক্ষম হন তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। অপর্ণা পা বাড়ালো।
লোকটা কিছু বললো না। অপর্ণা নিরাশ হয়ে কিছুদূর চলে যাবার পর দেখলো কে যেন পেছন পেছন আসছে। সাথে আলো। পেছন ফেরলো সে।
একজন বুড়ো মানুষ। কাঁধে গামছা। হাতে সেই ভয়ার্ত যুবকের ছাতাটি। লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে অপর্ণার কাছে এসে বললো, আমার নাম মলম মেমসাহেব । আপনি আশ্রয় চেয়েছিলেন তুফান ভাইয়ের কাছে, উনি রাজি হয়েছেন। চলুন আমার সাথে।
যে ঘরটিতে অপর্ণাকে শুতে দেয়া হয়েছে, সে ঘরটায় তেলাপোকা আরশোলা ভর্তি। ভ্যাপসা গন্ধ। পুরনো আমলের জমিদার বাড়ি হবে হয়তো। অপর্ণাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, খাওয়া দাওয়া করবে কি-না। জবাবে অপর্ণা 'না' বলেছিলো।
যুবকটি তার নাম 'তুফান ' বলে জানিয়েছিলো। সে বলেছিলো এখানে শান্তিতে ঘুমাতে পারেন। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে মলমকে জানাবেন দয়া করে। যুবকটি প্রথমে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো বলে হয়তো ওকে আশ্রয় দিতে রাজি হয়নি। পরে কী ভেবে মলমকে পাঠিয়েছিলো। এখন পর্যন্ত আচার-ব্যবহারে খুব ভদ্রতা দেখিয়েছে। অপর্ণা ভাবছে আর আস্তে আস্তে ঘুমের ঘোরে তলিয়ে যাচ্ছে।
ঘরের ভেতর আবছা আলো। কে যেন হাঁটছে। অপর্ণার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তুফান নামের সেই যুবকটি। হাতে একটা গ্লাস। শোয়া থেকে উঠে পড়ে অনন্যা।
নিন, গ্লাসের দুধটুক পান করুন, গরম দুধ। জানি, অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আপনি ক্লান্ত। দুধ পান করলে শরীরে শক্তি পাবেন।
অপর্ণা কোনো কথা বললো না, সে দুধটুকু পান করে ফেললো। আসলেই তার তৃষ্ণা পেয়েছিলো।
এবার ঘুমান। যুবকটি চলে যাচ্ছিলো। ডাক দিলো অপর্ণা।
এ বাড়িতে কোনো মেয়ে মানুষ নেই কেন?
যুবকটি যেন ওর কথা শুনতেই পায়নি। সে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কোথায় যাবেন? কোন বাড়ি?
নারায়ণপুর, দত্ত বাড়ি। বিশ্বনাথ দত্ত আমার দাদু । জবাব দিলো অপর্ণা।
গভীর ঘুমের তলদেশ থেকে আস্তে আস্তে অপর্ণা জেগে উঠলো। তারপর চোখ মেলে দেখলো তার দাদু বিশ্বনাথ দত্ত তার সামনে বসে আছে।
অপর্ণা কোনো কথা বলছে না। ভাবছে গত রাতের সেই ঘটনা। সেটা কি তাহলে স্বপ্ন? কোথায় সেই যুবক তুফান? সে তো তুফানের বাড়িতে ঘুমিয়েছিল। হঠাৎ তার চেতনা ফিরে এলো। সে বললো, দাদু তুমি? আমাকে কে এখানে আনলো?
তুই কখন এলি মা? আমি তো চিন্তায় অস্থির। এ ঝড়-বৃষ্টির রাতে কীভাবে, কখন এলি তুই?
ফ্যালফ্যাল করে দাদুর দিকে তাকিয়ে আছে অপর্ণা। ভাবছে গতরাতের কথা। সে তো আশ্রয় নিয়েছিলো তুফান নামের সেই যুবকটির বাড়িতে। যুবকটির হাতের এক গ্লাস দুধ পান করলো সে। তারপর ঘুমের ঘোরে অচেতন।
জানিনা দাদু , নিজে আমি এখানে আসিনি। ঝড়-বৃষ্টির রাত। আমাদের ট্রেন লেট হয়। স্টেশনে আসে রাত বারোটায়। রিক্সা না পেয়ে আমি একা একা হাঁটতে শুরু করি.........। পথে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি খুলে বললো অপর্ণা।
তাহলে তুই বলেছিস ঘটনা স্বপ্ন নয়; বাস্তব। প্রশ্ন করলো বিশ্বনাথ দত্ত ।
স্বপ্ন হবে কীভাবে? তাহলে আমি কাল রাতে কীভাবে এলাম? আমি যদি রাতে তোমার বাড়িতে আসতাম তাহলে তো তোমাদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে ঘরের দরজা খুলে আসতাম। কিন্তু আমি এই ঘরে এলাম কীভাবে?
সকালে উঠে দেখি, এ ঘরের দরজা আবছা খোলা। কেউ হয়তো বাইরে থেকে কোনো লোহার রড দিয়ে দরজা খুলে তোকে এখানে রেখে গেছে।
অপর্ণা বিভ্রান্তের মতো ঘরের চারপাশে তাকাতে লাগলো।
কিন্তু আমাকে সে লোকটি কীভাবে এখানে এনে রেখে গেছে? আমি কেন কিছুই টের পেলাম না?
তোকে সম্ভবত: দুধের সাথে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। রহস্যের জাল ছিন্ন করে সামান্য হাসলো বিশ্বনাথ দত্ত । তা' তুই কি সেই যুবকটির নাম জানিস? যার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলি?
যুবকটি তার নাম 'তুফান' বলে জানিয়েছিলো, তাদের বাড়িতে কোনো মেয়েছেলে ছিলো না।
লাফিয়ে উঠলো যেন বিশ্বনাথ দত্ত । চোখ কপালে তুলে বলতে লাগলো সে, তুফান! সে তো একটা ডাকাত! খুনি, সর্বহারা কমরেড। স্বাধীনতার যুদ্ধে গিয়েছিলো, যুদ্ধ শেষে সে তার অস্ত্র জমা দেয়নি। বলে, দেশতো এখনও স্বাধীন হয়নি। তারপর থেকে একটা দল গঠন করে- কম্যুনিস্ট - চরমপন্থী দল। এ দল দেশে নিষিদ্ধ। তোর কোনো ক্ষতি করেনি তো? অপলক নেত্রে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে আছেন দাদু ।
হাসে অপর্ণা। দাদু ! যদি ক্ষতি হতো, তাহলে কি ওরা এখানে এনে আমাকে রেখে যেতো? অবশ্যই মেরে ফেলতো। লোকটি আমার গায়েও টাচ করেনি।
বিড়বিড় করে কথা বলছে বিশ্বনাথ দত্ত , লোকটি সম্পর্কে অনেক কথা কানে আসে। সবাই বলে, লোকটি খারাপ। মাওবাদী, কম্যুনিস্ট। ওরা সবাই ডাকাতি করে, খুন করে। কিন্তু এতো রাতে একজন যুবতীকে কাছে পেয়েও কেন মানুষের অগোচরে নিজ বাড়িতে রেখে গেলো? এর রহস্য ভেদ করতেই হবে।
ভাবছে অপর্ণা। হাঁ যাই হোক , রহস্য ভেদ করতেই হবে।
পরদিন দুপুর। দাদুসহ সেই ভাঙা বাড়িতে হাজির হলো ওরা। কিন্তু সেখানে কোনো জন-প্রাণীর বাস পর্যন্ত যেন নেই। আশেপাশের মানুষরা জানিয়েছে, এখানে কোনো মানুষ থাকে না। বাড়িটি পরিত্যক্ত। রাতে শুধু আলো দেখা যায়। সবাই বলে এ বাড়িতে জিন-ভূত বাস করে। রাতে ভূতের চিৎকার শোনা যায় বলে এ বাড়িতে ভয়ে কোনো মানুষ আসে না।
রহস্য আরও ঘনীভূত হলো। আবার গেলো ওরা। তবে দিনে নয়, রাতে। ঠিক বারোটায়।
দরজায় টোকা দিতেই ভেতর থেকে সাড়া এলো। কে?
আমি অপর্ণা।
কিছুক্ষণ নীরবতা। দরজা খুললো না কেউ। শুধু পায়ের ধুপধাপ শব্দ।
প্রায় পনেরো মিনিট পর খুললো দরজা। সেই যুবক, তুফান। হাতে একটা স্টেনগান তাক করা অপর্ণার বুকে। পেছনে আরও দশ-পনের জন। ওরা সবাই নিশ্চলভাবে অপর্ণা ও তার দাদুর বুকে দিকে তাক করে অস্ত্র ধরে আছে। ইঙ্গিতে অপর্ণাকে ভেতরে আসতে বললো তুফান। ওরা ভেতরে প্রবেশ করলো।
নীরবতা ভাঙল অপর্ণা। এভাবে আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করে আছেন কেন?
তুমি নিশ্চয়ই পুলিশ নিয়ে এসেছ, তাই না অপর্ণা? রহস্যময় হাসি হাসলো তুফান। যদি আমার কথা সত্যি হয়, তাহলে তোমাদের দু'জনেরই বিপদ আছে।
অপর্ণা তাকিয়ে আছে তুফানের চোখের দিকে। সে ভাবতে থাকে- এই যুবকটিই সেই যুবক, যে কি-না অপর্ণাকে দেখে ভয় পেয়েছিলো? যে কি-না নিজ হাতে তাকে দুধ পান করিয়েছিলো। অথচ আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। বিদ্রোহী বিদ্রোহী ভাব। যেন ভগবান ছাড়া কাউকে ভয় পায় না। আশ্চর্য!
বলুন, ধমকে উঠলো তুফান।
আমি কখনো উপকারীর অপকার করি না সুললিত কণ্ঠে বললো অপর্ণা। আপনি আমার উপকার করেছেন, আর আমি আপনার অপকার করবো? আপনি যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, তাহলে তার বিচারের ভার রাষ্ট্রের, আমার একার নয়। আপনি আমার হিতাকাঙ্খী।
তুফানের সাথীরা কোনো কথা বলছে না। ওরা অপর্ণা এবং বিশ্বনাথ দত্তের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। তুফান সঙ্গীদের ইশারা করতেই ওরা অস্ত্র নামিয়ে রাখল।
হাসলো অপর্ণা। আমাকে বিশ্বাস করলেন? কিন্তু কেন? যদি বাইরে পুলিশ এসে থাকে?
সঙ্গীরা অস্ত্রের দিকে হাত দিতেই তুফান ইশারায় তাদের অস্ত্র উঠাতে বারণ করলো। ওরা নিষ্ক্রিয় রইলো।
আপনি কেন এসেছেন বলুন? তুফান জানতে চাইলো।
আমি আপনার হৃদয়ে কিছু মানবতার আলোর সন্ধান দেখতে পেয়েছি। তাই এসেছি আপনাকে সত্যের পথে নিয়ে যেতে। আপনি কি আমার সাথে একই ভেলায় সঙ্গী হয়ে যাবেন চিরসত্যের পথে?
হাসলো তুফান। হা হা হা করে পাগলের মতো হাসি। সেই হাসি সারা ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে আবার প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এলো। হাসি থামিয়ে যেন কৌতুকের ছলে বলতে লাগলো, আপনি জানেন না কে আমি! যদি জানতেন তাহলে এ কথা বলতেন না!
কে আপনি? কী পরিচয় আপনার? অপর্ণা যেন বিমোহিত হয়ে পড়েছে।
আমি তুফান। আমার বাবা-মা, ভাই-বোনদের হারিয়েছি স্বাধীনতার যুদ্ধে। আর হারিয়েছি আমার মনের মানুষটিকে। তার নাম মুক্তা। পুরো নাম মুক্তা ঘোষ , যাকে আমি পৃথিবীর কোটি কোটি টাকা মূল্যের হীরা-জহরতের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম। সেই তাকেও হারিয়েছি। আপনজনদের হারানোর দুঃখ-কষ্ট যাতনা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রীয় প্রতারণা, সহিংসতা, অন্যায় হত্যাকাণ্ড আমার বুকে কষ্টের আগুনের পাহাড় হয়ে জমেছে। তাই আজ আমি মনের ভিতর ভালোমানুষটিকে, আমার ব্যক্তিত্বকে চির নির্বাসন দিয়েছি। আজ আমি আর তুফান নই, একজন চরমপন্থী। কোনো মানুষ চরমপন্থা গ্রহণ করে কেন জানেন? জানেন না। যারা স্বাধীনতার পর জন্মগ্রহণ করেছে তারা কোনোদিনও জানতে পারবে না এ দেশ গঠনের প্রকৃত ইতিহাস। যারা এ দেশের জন্যে প্রকৃত অর্থে রক্ত ঝরিয়েছে, প্রিয়জনকে হারিয়েছে তাদের এই আত্মত্যাগের কথা অনেকেই জানে না। এই আমি তুফান। আমার নাম স্বাধীনতার যোদ্ধাদের নামের তালিকায় ওঠেনি। কোনোদিন কেউ জানবেও না যে, তুফান নামের কথিত সন্ত্রাসী চরমপন্থী মানুষটি স্বাধীনতার একজন নির্ভীক সাহসী সংগ্রামী যোদ্ধা ছিলো। যে কি-না দেশের জন্যে, মাতৃভূমির জন্যে, দেশের মানুষের দুঃখ-কষ্ট, দুর্দশা, শোষণ-বঞ্চনা লাঘবের জন্যে নির্বিকারে একের পর এক ট্রিগারে চেপে অত্যাচারী
শোষক -হানাদার ও তাদের দোসরদের ভূপতিত করেছিলো।
তুফান একটু দম নিলো। পাশের টেবিল থেকে এক গ্লাস জল পান করলো। তারপর বলতে লাগলো, এভাবেই তুফান নামের যোদ্ধারা মনের কষ্টে যুদ্ধ করে মরে, শহীদ হয়। কেউ তাদের খবরও রাখে না। স্বাধীনতা সংগ্রামী যোদ্ধা বা শহীদদের কাতারে তাদের নামও উঠে না। কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামী যোদ্ধাদের তালিকায় বাহাদুর হিসেবে খ্যাতি পায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের গণধর্ষণকারী হানাদারদের দোসররা , দালালরা । ওরা মন্ত্রীদের সাথে ঘুরে বেড়ায় সরকারি গাড়িতে। ওদের আজ গাড়ি-বাড়ি সুউচ্চ ইমারত। কোটি কোটি টাকার মালিক ওরা। দেশ স্বাধীন হবার এতদিন পরও কেন ওদের বিচার করা গেলো না। যদি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার মীরজাফর, দালালদের অন্যায়ের জন্যে বিচার না হয়, তাহলে আমার মতো তুফানের বিচার হবে কেন? কেন? তুফানের বজ্রমুষ্টির প্রতিঘাতে বিদ্যুৎগতিতে আঘাত হলো পাশের টেবিলটাতে। সবাই কেঁপে ওঠলো।
আবার বলতে লাগলো তুফান, কিন্তু পবিত্র দেশমাতা দেশের সাহসী সন্তানদের কখনো ভুলে না। এই যেমন ভুলিনি আমি। আমি আজও যে বেঁচে আছি, একথা কেউ জানে না। কারণ আমি জানতে দেইনি।
কেন জানতে দেননি? প্রশ্ন করলো অপর্ণা।
তুমি বুঝবে না স্বাধীনতার পরে জন্ম গ্রহণকারিণী মেয়ে! তুমি বুঝবে না। এ বুকে দুঃখ-যন্ত্রণা ও সীমাহীন কষ্টের প্রচণ্ড লাভার উদ্গীরণ হচ্ছে। স্বজন হারানো স্বাধীন দেশে আমরা কি এখনও পেরেছি নিম্নশ্রেণীর অভুক্ত মানুষের মুখে আহার জোটাতে? আমরা কি পেরেছি, দেশের স্বাধীনতার শত্রুদের নির্মূল করতে? আমরা কি পেরেছি, বেকার যুবকদের কাজের সন্ধান দিতে? কী পেরেছি আমরা? পেরেছি শুধু অমূলক বিষয় নিয়ে অযথা দলাদলি, মারামারি করে জনগণকে প্রতারিত করতে। আর পেরেছি, গরিব মেহনতি মানুষদের ঘামের অর্থগুলো শোষণ, দুনীতি করে বিশাল বিশাল অট্টালিকা গড়তে। কালো টাকার প্রভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে আজ আকাশচুম্বী প্রায়। গরিবরা যা আয় করে, ব্যয় তার চেয়ে হাজারগুণ; ফলে তাদের জীবন-জীবিকা থমকে দাঁড়িয়েছে। মানুষ না খেয়ে ডাস্টবিনের কাছে মরে পড়ে থাকে এখনও , যা আমি নিজের চোখে দেখেছি। দেশের লুটেরারা দেশটাকে দুনীতির শীর্ষে বহু বার আরোহণ করিয়েছে- এ ছাড়া আর কী পেরেছি আমরা। বলো, জবাব দাও অপর্ণা। আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো যেন জ্বলে উঠলো তুফান নামের এ চির সংগ্রামী যুবকটি।
অপর্ণা নির্বাক।
তুমি আমাকে আলোর পথে নিতে এসেছ? কী লাভ আমি একা আলোর পথে যেয়ে? যেখানে সারাটা দেশ অন্ধকারে ডুবে আছে, সেখানে আমি একজন সুবিধাভোগী হয়ে কী লাভ! তার চেয়ে আমার অন্ধকারের পথই ভালো। হয়তো আমার মৃত্যু হবে পুলিশের একটি গুলিতে। কিন্তু আমার সহযোদ্ধারা থাকবে। তাদের মাঝে বেঁচে থাকবো আমি। যতদিন বেঁচে থাকি, দুনীতি, শোষণের বিরুদ্ধে লড়ে যাবে আমি ও আমার সঙ্গীরা।
অপর্ণা তাকিয়ে আছে তুফানের দিকে। সে ভাবে, যে তুফানের হাতে মরেছিলো দালালরা , হানাদার বাহিনী, আজ সেই তুফান চরমপন্থী সন্ত্রাসবাদী । কিন্তু কেন? কী চায় সে? কেন বেছে নিয়েছে চরমপন্থা? শুধুই খুন-খারাবির জন্যে? ডাকাতি করার জন্যে, নাকি এর মধ্যে কোনো সত্য লুকিয়ে আছে?
আপনার মতো লোকের খুবই দরকার এ সমাজে। বলতে লাগলো অপর্ণা। কিন্তু এভাবে নয়। আজ দেশ স্বাধীন। আমরা জানি, দেশে শোষণ-দুনীতি আছে, জনগণের মনে পাওয়া-না পাওয়ার কষ্টের পাহাড় আছে। এটি সত্যি কথা। সেজন্যে তো অস্ত্র দিয়ে এভাবে লুটতরাজ, খুন-খারাবি করে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে না। অস্ত্র ছাড়া, লাঠি ছাড়া কি শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়? পৃথিবীতে সত্যিকারার্থে অস্ত্র দিয়ে কোনোদিন চিরশান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ভালোবাসা, ত্যাগ, ধৈর্য, অধ্যবসায় দিয়ে। এভাবে অপর্ণা তুফানকে বোঝাতে থাকে - এরপর কী হয়েছিল, সেটা আমাদের জানা নেই। তুফান কী অপর্ণার কথা মেনে নিয়ে চরমপন্থার রাস্তা ছেড়ে মূল স্রোতে ফিরে এসেছিলো? এসবের উত্তর আমাদের কাছে নেই, বাস্তবতা এটাই যে এরকম বহু অজানা সংগ্রামী যোদ্ধা হারিয়ে গেছেন এই হতাশা বুকে নিয়ে। কিছু স্বার্থপর, ধান্দাবাজ লোক সর্বকাল সব পরিস্থিতিতে নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। যোদ্ধারা যেমন আছেন, সেরকম ধান্দাবাজরাও থাকবে - তবে এদের চিহ্নিত করে নিষ্ক্রিয় করতে হবে ও এদের যথাযোগ্য বিচার হওয়া দরকার। এই কারণে সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি।কারণ জনগনই পারেন এদের চিহ্নিত করতে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন