ভ্রমবিলাস - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

স্কুল জীবনের  পরেই শুরু হয় কলেজ জীবন আর অনেক স্বাধীনতার দরজা খুলে যায়। জীবনের শাসনের ভার আলগা হওয়াতে আর বয়সন্ধি কাল মানুষকে ভীষণ রোমান্টিক করে তোলে। জীবনের চলার পথে তখন একজন সঙ্গীর অভাব ভীষণ ভাবে অনুভূত হয়। তবে সরস্বতী পূজা আর ভ্যালেন্টাইন্স ডে এর প্রকোপ আরো বৃদ্ধি পায়।
আজ আকাশের মুখটা ভার।সকাল থেকেই দু এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে।না বলা কথাগুলো অবনের মনেও জমাট বাধা মেঘের সৃষ্টি করেছে।আজ তোর্সাকে বলতেই হবে মনের গোপন কথাটা।সেই প্রথম যেদিন নবীন-বরণে দেখেছিলো তাকে নীলাম্বরী শাড়িতে সেদিন থেকেই মনের জলরঙে শুধু তারই ছবি এঁকেছে অবন ।একটু একটু করে বন্ধুত্ব হয়েছে তোর্সার সাথে কিন্তু ভালোবাসার কথাটা সাহস করে বলে উঠতে পারেনি এখনও।আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে মানে প্রেম দিবস ।আজ মনের মেঘটাকে আলগা করার দিন আজ বলবে সে তোর্সাকে তার ভালোবাসার কথাটা।সব ঠিক থাকলে মেঘ সরে গিয়ে তোর্সার ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজবে তার হৃদয়।
কলেজে ঢোকার মুখেই দেখলো ভ্যানে করে গোছা গোছা লাল গোলাপ বিক্রি হচ্ছে।বাইকটাকে স্ট্যান্ড করে এক গোছা লাল গোলাপ কিনে নিলো আবীর।
-----'কী রে কার জন্য কিনলি গোলাপ?'
প্রশ্নটা শুনেই চমকে তাকালো অবন।পাশেই বিজয় আর গোপা দাঁড়িয়ে হাসছে।উফফ!এই সময়ই এ দুটোকে এখানে আসতে হলো।এখন শুরু করবে টিপ্পনী করা।
বিজয় বললো------ 'কার জন্য আবার বুঝলিনা।এখনই ছুটবে আর্টস বিল্ডিংয়ে।কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছি সায়েন্স বিল্ডিং ছেড়ে আর্টস বিল্ডিংয়েই সময়টা বেশি কাটাচ্ছে অবন ।'
গোপা ব্যঙ্গ করে বললো ------'হুম নতুন বন্ধু পেয়েছে, কিন্তু কোন লাভ নেই।'
কথাটা শুনে একটা সজোরে বুকে ধাক্কা লাগলো অবনের ।পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো গোপার দিকে 
-----'লাভ নেই মানে?
-------'মানে তাকে খানিক আগেই একজনের বাইকে চেপে কলেজে আসতে দেখলাম।প্রায়ই তো দেখি তার সাথেই কলেজে আসে?আজ তো হাতে একগোছা গোলাপও দেখলাম বোধহয়।' 

কথাটা শুনেই মুখটা শুকিয়ে গেলো অবনের ।আর অবনের মনের মধ্যে ঝড় বইতে লাগলো সেই ঝড়ের দাপটে তছনছ হতে লাগলো সাজানো স্বপ্নগুলো।তবে কী গোপা যা বলছে সত্যি?অবন একটু চুপ করে বললো 
------'তোর্সা তো আমায় কোনদিন বলেনি ওর বয়ফ্রেন্ড আছে?'
--------'ওই দেখো মেয়েরা কী তার অ্যাফেয়ারের কথা ফলাও করে বলে নাকি রে? তার মধ্যে ছেলেটা আবার কলেজের বাইরের।আর তোর সাথে কতদিনের বন্ধুত্ব ওর যে সব তোকে বলবে?'
তা ঠিক। গোপা ঠিকই বলেছে খুব কাছের বন্ধু তো নয় অবন তোর্সার ।তাই হয়তো বলে উঠতে পারেনি এখনও।বুকটা ভীষণ ব্যথা করছে,খুব কষ্ট হচ্ছে অবনের ।এভাবে সব শেষ হয়ে যাবে ভাবেনি সে।তাও একবার সরাসরি প্রশ্ন করতেই হবে তোর্সাকে ?
'-----বিজয়,গোপা তোরা ভেতরে যা আমি একটু আসছি।'
-------'যা ঘুরে আয় আমার কথা তো বিশ্বাস হলোনা তোর।'
-------'হ্যাঁ রে আমার মনের মধ্যে যে কী হচ্ছে এখন তা একমাত্র আমি জানি, নিজেদের হলে বুঝতে পারতি। যতক্ষন না ওর মুখ থেকে একবার ....'
বিজয় বললো-------' ওকে একবার কথা বলতে দে না গোপা।যা ভাই একবার যা তুই।'
পাশের গেট দিয়ে আর্টস বিল্ডিংয়ে ঢুকলো অবন চোখ দুটো তার শুধু তোর্সাকেই খুঁজছে।কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা হতে জিজ্ঞাসা করলো
------ 'দেখেছিস তোর্সাকে?'
-----'একজন বললো ওকে ক্যান্টিনে দেখেছিলাম ওর বান্ধবীদের সাথে।'
ক্যান্টিনের দিকে ছুটলো অবন ।ক্যান্টিনে ঢুকেই দেখলো একেবারে কোনের টেবিলটায় বসে আছে তোর্সা ।লাল সালোয়ারে কী অসম্ভব সুন্দর লাগছে ওকে।ঠিক যেন এক টুকরো ঝলমলে রোদ্দুর।মনটা আবার বিষাদে ছেয়ে গেলো অবনের ।এই মেয়েটা কখনো আমার হবেনা?আমি কোনদিন ওর ভালোবাসা পাবোনা।এই মুহূর্তটা এখানেই থেমে যাক।আমি শুধু চোখ ভরে ওকেই দেখি।ক্যান্টিনের কোলাহলে ভাবনায় ছেদ পড়লো।নিজেকে একটু সামলে তোর্সার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো অবন। বললো
---- 'তোর্সা একটু কথা আছে তোর সাথে?'
------'হ্যাঁ বলনা।আয় না বোস আমাদের সাথে।চা খাবি?'
-------'না আমি একটু একলা কথা বলতে চাই তোর সাথে।'
পাশ থেকে তোর্সার বান্ধবী মধুমিতা কনুই দিয়ে এক ধাক্কা দিলো তোর্সাকে ।ফিসফিস করে বলল
-----' কী ব্যাপার আজকের দিনে একলা কথা বলতে চাইছে,হাতে আবার লাল গোলাপের গোছা।আজ নির্ঘাত প্রপোজ করবে তোকে।উফফ কী হ্যান্ডু লাগছে রে মালটাকে হোয়াইট কুর্তা আর ব্লু ডেনিম জিন্সে।
-------'চুপ করবি তুই মধু, চোখ বড় বড় করে বললো তোর্সা ।
------'প্লিজ একটু ওদিকটায় আয়,আমি অপেক্ষা করছি বলে বেরিয়ে গেলো অবন।
-----'তর যেন আর সইছেনা।'
------'উফফ মধু প্লিজ স্টপ ইট।'বলে অবনের পেছন পেছন বেড়িয়ে গেলো তোর্সা ।
কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালো অবন ।সকালের বৃষ্টিতে গাছটা তখনও সিক্ত।ছিটেফোঁটা জল ঝড়িয়ে দিলো অবনের শরীরে।অবন ভাবলো ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভেজা বোধহয় আর হলোনা।তোর্সা এসে বললো
-----' বল কী বলবি?'তারপর টান দিয়ে অবনের দু ঠোঁটের মাঝখান থেকে জ্বলন্ত সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বললো কলেজের মধ্যে স্মোক করছিস,কোন স্যারের চোখে পড়লে।
------'সরি আসলে মাথাটা ধরেছে।'
-------'আচ্ছা বল কেনো ডাকলি?'
------'কখন এলি তুই কলেজে?' 

-------'আধঘন্টা আগে হবে?কেনো বলতো?'
------'না গোপা বললো তোকে নাকি একজনের সাথে কলেজে আসতে দেখেছে?কে ওটা তোর্সা ?তোর বয়ফ্রেন্ড?
গোপার কথা শুনেই মাথাটা  ভীষণ গরম হয়ে গেলো তোর্সার ।
বললো ------'কেন গোপা এটা বলেনি সে আমার কে হয়?যা না ওকে গিয়েই জিজ্ঞাসা কর'।
-------'এভাবে কথা বলছিস কেন তোর্সা ?আসলে তুই তো আগে কখনো বলিসনি তোর কারো সাথে সম্পর্ক আছে তাই।'
------কেন বলবো বলতো?এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার।কেউই বলেনা সব কথা। হয়তো তুইও না ।
------'মানে?'
-------'ছাড় সেসব ।'
তোর্সার কথাগুলো তীরের মতো বিঁধলো অবনের বুকে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলো সে।
------'তা এই ফুলগুলো তোকে কে দিলো অবন ?
গোপা নিশ্চয়ই?'
হৃদয় পুড়ে ছাড়খার হচ্ছে অবনের তোর্সার কথার দাবানলে।আর কত কষ্ট দেবে তাকে মেয়েটা?নিজের বয়ফ্রেন্ড আছে বলে তাকে শুধু শুধু এবার গোপার সাথে জড়িয়ে ছিঃ.....
রেগে গিয়ে বললো অবন ------'সেটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার আমি কাউকে উত্তর দিতে বাধ্য নই।'
-----'সেটাই অবন কেউ কাউকে উত্তর দিতে বাধ্য নয়' বলে চলে গেলো তোর্সা ।তার যাওয়ার পথে পদপিষ্ট হলো ঝরে পড়া বৃষ্টি সিক্ত নিষ্পাপ কয়েকটা আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া।সে দিকে তাকিয়ে চোখটা ঝাপসা হয়ে গেলো অবনের ।সেদিন কলেজ ছুটি হওয়ার পর অবনেরও চোখে পড়লো একটা ষন্ডামার্কা ছেলের বাইকে চেপে তার কোমর জড়িয়ে ধরে কলেজেটাকে পেছনে ফেলে চলে গেলো তোর্সা ।অবন ভাবলো কী আছে ওর যেটা আমার নেই।
দিন পনেরো হয়েছে আর্টস বিল্ডিংয়ে আর যায়না অবন ।ভাঙা হৃদয়টা কে নিয়ে শুধু কলেজ আর বাড়ি করে বেড়ায়।বন্ধুবান্ধবদের সাথে আড্ডাতেও আর খুব একটা দেখা যায়না তাকে।আজ অবন কলেজে ঢুকতেই বিজয় বললো-----' ভাই শুনেছিস কথাটা?'
------'কী রে?'
------'তোর্সার তো'
-----'প্লিজ বিজয় ওর ব্যাপারে কোন কথা আমায় বলিসনা।'
------'না মানে মধুমিতা বলছিলো হাসপাতালে..'
অবন বাকিটা না শুনেই কলেজে ঢুকে গেলো।কিন্তু কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে তার।কী বলছিলো বিজয়?কে হাসপাতালে?আর তোর্সার কথাও কী যেন বলছিলো?কিছু হয়নি তো মেয়েটার?সে কেন এতো ভাবছে?কোন অধিকারে?কিন্তু এতো মনটা ব্যাকুল হচ্ছে কেন তার?কোথায় গেল বিজয়? ঐ তো 
-----'এই শোন কী বলছিলি যেন একটু আগে,তোর্সার ব্যাপারে?'
------'আরে মধুমিতা বলছিলো তোর্সার নাকি খুব শরীর খারাপ হয়েছিলো।হাসপাতালে ছিলো। কাল ছুটি হয়েছে হাসপাতাল থেকে।'
------'কী বলছিস?'
------'হ্যাঁ ভাই তাই তো শুনলাম।'
অবন ভাবলো কী হলো মেয়েটার হঠাৎ করে?কিছুদিন আগেও তো কী সুন্দর রঙীন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াতো।
-------'এই অবন কী অতো ভাবছিস বলতো?'
------'না মানে এখন কেমন আছে?জানিস।'
-------'হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিয়েছে যখন তখন মনে হয় ভালোই আছে।শোননা বলছি কী মধুমিতা আর ওর এক বান্ধবী যাচ্ছে আজ রূপসাদের বাড়ি ওকে দেখতে। ভাবছি আমি আর গোপাও ঘুরে আসি ওদের সাথে।খবরটা যখন শুনলাম তখন একবার যাওয়াটা তো উচিত। তুই যাবি?'
------'আমি?না মানে আমার যাওয়াটা কী উচিত হবে?' ------'ধূর চলতো উচিত আর অনুচিত আর কিছু না হোক তোরা বন্ধু তো।'
এ কী শরীরের অবস্হা হয়েছে তোর্সার ।মেয়েটার হরিণের মতো চোখ দুটোতে যেন অমাবস্যার গাঢ় কালো অন্ধকার নেমে এসেছে।বিছানায় শুয়ে আছে সে।এতোটা অসুস্হ হলো কী করে?
গোপা জিজ্ঞাসা করলো-----' কেমন আছিস তোর্সা?'
------'এখন একটু ভালো।'
ওদের কথার মাঝেই ঐ ষন্ডামার্কা ছেলেটা ভেতরে ঢুকে বললো------' ওষুধটা এবার খেয়ে নিতে হবে।'
ওর কথায় বাধ্য মেয়ের মতো ওষুধগুলো খেয়ে নিলো তোর্সা ।অবন বুঝলো ব্যাপারটা অনেকদূর গড়িয়েছে।বাড়িতেও যাওয়া আসা রয়েছে ছেলেটার।অজান্তেই একটা দীর্ঘ নিশ্বাস বেড়িয়ে এলো বুক থেকে। খানিকবাদেই রূপসার মা এলেন মিষ্টির প্লেট সাজিয়ে নিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
------'তোমরা রূপসার বন্ধু প্রথমবার এসেছো একটু মিষ্টিমুখ করো।তারপর বললেন এই যে মেয়েটা বৃষ্টিতে ভিজে,না খেয়ে অনিয়ম করে বাধিয়ে বসলো।তারপর সেই ছেলেটাকে দেখিয়ে বললো আর এই হয়েছে আর একজন, বোন অন্ত প্রাণ।সব কাজ ছেড়ে বোনের সেবা করে চলেছে। ওহ! তোমাদের সাথে তো আলাপ নেই আমার ছেলে তরুণ।'
ভীষণ জোরে একটা বিষম খেলো অবন ....দাদা!তোর্সার দাদা।তাহলে কেন মিথ্যে বললো তোর্সা ?গোপারও একই  অবস্থা সেও ভুল বুঝেছিলো।মনে মনে খুব লজ্জিত হলো।রূপসার চোখের দিকে চেয়ে বারবার উত্তরটা খোঁজার চেষ্টা করলো অবন।কিন্তু তাকে বারবার এড়িয়ে গেলো তোর্সা ।অবন মনে মনে ভাবলো তোর্সা কী কোনমতে বুঝে ফেলেছিলো তার মনের কথাটা।অবনকে হয়তো তার পছন্দ নয় তাই তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মিথ্যে একটা নাটক করলো।এর থেকে তো সরাসরি বললেই পারতো যে সে অবনকে পছন্দ করেনা।এই প্রশ্নের উত্তরগুলো জানতেই হবে অবনকে।বাড়িতে এসে অনেকবার ফোনে ট্রাই করলো সে তোর্সাকে ।
মধুমিতাকে বলে রাখলো অবন তোর্সা যেদিন কলেজে আসবে তাকে খবর দিতে।দিন সাতেক বাদে কলেজে এলো তোর্সা ।মধুমিতা খবর দিলে অবন বললো ------'ওকে বল আমি দেখা করতে চাই এখনই।'
খানিকবাদে মধুমিতা জানালো----' এখন হবেনা।আজ পাঁচটা পর্যন্ত ক্লাস আছে।ছুটির পর হতে পারে।
-------'ঠিক আছে আমি গেটের বাইরে অপেক্ষা করবো বলিস।'
অবনের আড়াইটেতে ছুটি হয়ে গেলো।
বিজয় বললো-----' ভাই বাড়ি যাবিনা?
-----' না একজনের সাথে একটা বোঝাপড়া আছে।তুই যা আমি পরে আসছি।'
ঠিক পাঁচটা‌। আর্টস বিল্ডিংয়ের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অবন ।গুটিকতক বান্ধবীর সাথে কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছে তোর্সা ।কমলা সালোয়ারে গোধুলির শেষ আভার মতোই স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে ওকে।অবনের সামনে এসে থামলো সে।তারপর বললো
------'মধুমিতাকে বলেছিস দেখা করতে। বল কী বলবি?'
------'এখানে না বাইকে বস।'
----'না '
------'কেন?'
-------'একটু পরেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে।ফিরতে দেরি হলে মা চিন্তা করবে।'
-----'করুক।আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আজকে কোথাও যাওয়া হবেনা তোর।বেশি সময় নেবোনা তোর। দরকার হলে আমি বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আসবো।বস শিগগির।'
অগত্যা উঠে বসলো তোর্সা।
একটু দূর এগোতেই ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এলো।শীতকাল।কলেজ ছুটির পর এ দিকটায় লোকজন একেবারেই থাকেনা।খানিকটা গিয়েই গাড়িটা দাঁড় করালো অবন ।তোর্সা নেমেই বললো
-----' যা বলার আছে তাড়াতাড়ি বল।'-
'-----এই মিথ্যে অভিনয়টার কী দরকার ছিলো তোর্সা ?'
তারপর তোর্সার কাছে গিয়ে তার  কাঁধের দুপাশে হাত রেখে ঝাঁকিয়ে বললো কেন করলি আমার সাথে এটা?'ঐ ষন্ডামার্কা ছেলেটা যে'
'------ঐ মুখ সামলে কথা বল' ক্ষেপে গিয়ে বললো তোর্সা ।
------'সরি মানে ঐ ভদ্রলোক যে তোর দাদা কেন বলিসনি আগে?'
------'ছাড় আমাকে লাগছে আমার। ছাড় বলছি।'
অবনকে এক ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো তোর্সা ।তারপর নিজেই অবনের কাছে গিয়ে তার বুকের কাছে জামাটা দু হাত দিয়ে খামচে ধরে বললো ------'কেন বলিনি?তুই কেন বলিসনি?'
------'আমি কি বলিনি।'
----'গোপার সাথে তোর সম্পর্ক আছে।বলেছিস তুই'
অবাক হয়ে গেলো অবন তোর্সার হাত দুটো বুকের কাছে চেপে ধরে বললো-----' কী বলছিস তুই এসব?কেন মিথ্যে বদনাম দিচ্ছিস?'
------'বাজে কথা বলিসনা।' 

-----'গোপা নিজে মুখে বলেছে আমায়?'
-----'গোপা বলেছে?কী বলেছে?'
------আমি একদিন ওকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম অবন তোর খুব ভালো বন্ধু না রে?ও বললো বন্ধু ছাড়াও আমাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে।'
-----হ্যাঁ তারপর?
------'তারপর আর কী?আমি আর কিছু জানতে চাইনি।'
-----'কেন জানতে চাসনি শুনি?'
-----আর শোনার ক্ষমতা ছিলোনা আমার।প্রথমদিনই ভালো লেগেছিলো তোকে।তারপর কখন যে জড়িয়ে পড়েছি বুঝতে পারিনি।'
-----'আর আমার শোনার ক্ষমতা ছিলো তাইনা?দাদাকে প্রেমিক।আর গোলাপ ফুলগুলো কে দিয়েছিলো তোকে তোর্সা সত্যি ব‌লতো?'
-----'আমিই কিনেছিলাম রাস্তা থেকে।মা এর লাল গোলাপ খুব পছন্দ তাই।ফেরার পথে যদি আর না পাই।'
----'আর তোর ফুলগুলো?নিশ্চয়ই গোপা?'
----'এক থাপ্পড় মারবো আর যদি একটা কথা বলেছিস। গোপার সাথে আমার সত্যি একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে। বিজয়কে তো চিনিস।ও আসলে আমার মাসতুতো দাদা। সুজয়ের  হবু বৌ লোপা।ওদের সম্পর্কটা বাড়ির সবাই জানে ।তাই হয়তো গোপা বলেছে।আর তুই সেটাকে নিয়ে ছিঃ ছিঃ।'
----'কী বললি ছিঃ ছিঃ।হ্যাঁ আমিতো খারাপ।তুই কখনো বলেছিস বিজয় গোপাকে ভালোবাসে?কখনো বলেছিস বিজয় তোর দাদা?'
------'হ্যাঁ ওদের সম্পর্কের কথাটা বলা হয়ে ওঠেনি
আর বিজয় আর আমি পিঠোপিঠি। তাই ওই ভাইয়ের সম্পর্কের থেকে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটাই বেশি।
পাগলি, এতোটুকু বুকে এতো অভিমান জমিয়ে রাখলি, ভুল বুঝে আমায় এতোগুলো দিন দূরে সরিয়ে রাখলি তাও আমায় একবার মনের কথাটা বললি না।
-----'বললে কী লাভ হতো তোর?'
----তাই তো আমার কী লাভ হতো?এতোগুলো দিন ধরে যে এতো কষ্ট পেলাম?
------কষ্ট পেলি না ছাতা?
----- কতো ভালোবাসি পাগলি তোকে এখনো বোঝাতে পারলাম না।তোর্সাকে কাছে টেনে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে নিজের বুকে মিশিয়ে দিতে  দিতে বললো অবন -----'এখানে আমার বুকে কান পাত শুধু তোর নাম শুনতে পাবি।'
মুহূর্তরা থমকে গেলো খানিকক্ষন।ভালোবাসার বৃষ্টিতে ভিজে গেলো দুটি মন।হুশ ফিরতে তোর্সার মনে হলো বাড়ি ফিরতে হবে অবনের বাহুডোর থেকে আলগা করতে চাইলো নিজেকে,আরো একবার কাছে টেনে তাকে আদরে সোহাগে চুম্বনে ভরিয়ে দিলো অবন ।সময় জানান দিলো বারবার এবার তোর্সার বাড়ি ফেরার পালা।
------'এবার বাড়ি যাবো'
------' আর একটু থাক আমার কাছে'
------ না রে অনেক দেরি হয়ে গেছে।'
-----'আমি বাড়িতে ছেড়ে দেবো বললাম তো।'
-----না বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত ছেড়ে দে তাহলেই হবে।'
বাস স্ট্যান্ডে এসেও দু চারটে বাস মিস করলো তোর্সা ।অবন বললো-----' তোকে ছাড়তে একদম ইচ্ছে করছেনা রে।আজ যদি সময় এখানেই থমকে যেতো।
-----'কালই তো দেখা হবে আবার অবন।'
বাস এলো উঠে পড়লো তোর্সা ।অবন মনে মনে বললো এই চঞ্চল পাহাড়ী ঝর্নাটা আমার।শুধুই আমার।রূপসার বাসটা চলে গেলো।না জানি কতক্ষন তার ফেলে যাওয়া পথের দিকেই চেয়ে রইলো অবন ।বুক পকেটে থাকা তার মুঠোফোনটা বেজে উঠতেই ঘোর কাটলো অবনের ।তাকেও যে ফিরতে হবে এবার।অন্ধকার শুনশান হাইওয়ের বড় বড় গাড়ীর হর্ণ ছাপিয়ে ভেসে আসছে তখন তার ফিকে হয়ে যাওয়া মুঠোফোনের রিংটোন 

......যখন.. নীরবে দূরে, দাঁড়াও এসে
যেখানে পথ বেঁকেছে। 
তোমায় ছুঁতে চাওয়ার মুহূর্তরা
কে জানে কি আবেশে দিশাহারা.....
শুরু হল দুজনের পথ চলা......

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।