ভালোবাসার স্বর্গ - পার্থ প্রতিম গুহ নিয়োগী।

আমাদের এই পৃথিবীর ৩ ভাগ জল আর ১ ভাগ স্থল, সেরকম বোধহয় মানুষের জীবনও ৩ ভাগ দুঃখ এবং ১ভাগ সুখ। কারোর জীবনে হয়ত নির্বিচ্ছিন্ন সুখ বলে কিছু হয় না - সকল সুখের মধ্যে ঠিক একটা ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে যায় - ফলে জীবনে দুঃখের উপস্থিতি অনিবার্য।
রেখা কালো বলেই বোধহয় ওর বাবা-মা ওর বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন । পোষ্ট গ্র্যাজুয়েশন সাইকোলজি নিয়ে করতে চাওয়ার মধ্যে রেখার অনেক স্বপ্ন লুকিয়ে ছিলো, কিন্তু ভারতে মেয়ে জন্মালে তাকে নিঃশ্বাস নিতে সময় না দিয়েই তার বিয়ের কথা  শুরু হয়ে যায়।মেয়ের গায়ের রঙ ফর্সা হলে আয়া মাসী মাড়ি বের  করে মেয়ের বাবাকে বলে,’মেয়ে ফর্সা হয়েছে। বিয়ের চিন্তা নাই। আমার কিন্তু ভালো শাড়ি  চাই।‘ বাচ্চাকে তখনো হয়তো বাপে দেখেইনি। আর কালো হলে? আয়া মাসী মুখটা আরো কালো করে বলবে,’চুক-চুক-চুক! একে মেয়ে তায় কালো! কী করে যে বিয়ে দেবেন!’অথচ আবহাওয়া অনুযায়ী ভারতের বেশীরভাগ মানুষের ই গায়ের রঙ কালো আর সেটাই স্বাভাবিক।এদেশের ফর্সা মুখে হাল্কা গোঁফের রেখা ওয়ালা মেয়েরাও সুন্দরী।এবং এদেশে যাদের ফর্সা বলা হয় ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো দেশে তাদের কালোই বলে। আমাদের চারদিকে এত প্রগতির পরও আজও মেয়েরা আমাদের সমাজের চোখে বোঝা। তাঁদের নিজের কোন বাড়ি নেই - থাকার জায়গা মানে বাপের বাড়ি নাহলে স্বশুর বাড়ি! 

রেখা কালো, মানে শ্যামবর্না। দীঘির মত গভীর টানা টানা কালো চোখ, মাথায় লম্বা ঘন চুল।হাতের আঙুল লম্বা।ওর চেহারা, কথাবার্তায় শিক্ষার সংযত প্রসাধন।রেখা মানা করলেও বাবা-মায়ের জেদের কাছে হার স্বীকার করলো। মায়ের তো সোজা কথা,’সাইকোলজি তে এম এ করে কী চাকরী পাবি? চাকরীর যা বাজার!’ রেখা রাতে ঠাকুমার কাছে শোয়। রেখার ঠাকুমা স্বশিক্ষিত মানুষ।নাতনির এতো তাড়াতাড়ি  বিয়ে চাননি।তবু ওনার কথাতেই এম এ পরীক্ষায় বসতে পারলো। ঠাকুমা  স্বান্তনা দেন আদরের নাতনিকে।
-কাইন্দোনা দিদি! সোয়ামী মানুষ ডা  যদি ভালা অয়, তারে নিজের ইচ্ছা কইবা। হেয় চাইলে তুমারে পড়াইবার পারব। 

রাজু পেশায় chartered accountant ।রেখার ছবি দেখেই তার পছন্দ হয়েছে। গায়ের রঙ টং ওর কাছে কিছু গুরুত্ব পায়না। শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী মেয়ে হলেই হবে। রাজুর একটাই  ভয় বউ যেন কর্কশ কন্ঠী না হয় আর ঝগড়া যেন না করে। রাজুর মা এবং দিদিরা  খুব ঝগড়ুটে। রাজুর মা-বোনের টাইম পাস ই হচ্ছে ঝগড়া। হয় প্রতিবেশীর সাথে নইলে নিজেদের মধ্যেই।
নগদ টাকা নেওয়ার ইচ্ছে ছিলো রাজুর বাবা-মায়ের কিন্তু জীবনে প্রথমবার রাজু জেদ দেখালো। বলল, পণ নিলে আমি শ্বশুরবাড়ীতে ঘরজামাই হয়ে থাকব।
-তোর দিদিদের বিয়েতে পণ দিয়েছিনা!
-সে দিদিরাও সমর্থন করেছে বলে।আর ওদের দেওয়া পণ তুমি আমায় বেচে সুদে-আসলে মেটাবে? সে হবেনা!পণ গরু-ছাগলেরা নেয়।
রাজুর বড়দির গায়ে লাগলো। তার বর এক চোখে দেখেনা তবু একলাখ টাকা পণ আর স্কুটার নিয়েছে কারন সরকারী চাকুরে।মেজো দিদির বর ক্যাশ নেয়নি তবে বাকী সব ই  চেয়ে  নিয়েছে।অনেক ঝগড়া, কান্নাকাটির পরে বিয়ের দিন ঠিক হলো। রাজু চাকরী করে গুজরাটে।সে বিয়ের সাত দিন পরেই বউ নিয়ে চলে গেলো নিজের কর্মস্থলে। 

রেখাও একটা এনজিও তে  চাকরী পেলো। মাইনে ভালোই। ঋজু অবশ্য বলেছে ও চাইলে পিএইচ ডি ও করতে পারে। রেখা খুব খুশী রাজুকে পেয়ে।গায়ের রঙ নিয়ে বিয়ের আগে কত কথা  শুনেছে কিন্তু রাজুকে দেখো, ওর চোখে রেখা সবচেয়ে সুন্দরী।  রাজুর মন কেড়েছে রেখার গান। ওর গান চোখ বন্ধ করে শুনলে মনে হয় গীতা দত্ত গাইছেন। না ঠিক গীতা দত্ত ও না। বেগম আখতার আর গীতা দত্তের মিক্সড। রোজ রাতে রাজুর আবদারে অনেক গান শোনাতে হয়। 

দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে  গেছে।নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া সুন্দর হওয়ায় বিয়ের পরে পরেই মা-বাবা হতে চায়নি।এখন ওরা প্ল্যান করেছে নতুন কাউকে আনার। রাজুর ইচ্ছে রেখার মত একটা মেয়ে হোক আর রেখার ইচ্ছে ছেলে-মেয়ে যেই আসুক সুস্থ, নীরোগ হলেই হবে। কালো-ফর্সা নিয়ে তার জীবন ঘোলাটে করবেনা। 

ভালোবেসে যে দেহ মিলিত হয় তা যেন স্বর্গীয় সুখ বহন করে আনে। তিন বছরে রেখা একটু ভরাট চেহারার হয়েছে বিয়ের সময় বেশ  রোগা ছিলো। রাজুর স্পর্শে যৌবন এখন উছলে পড়ছে রেখার । কে বলবে এই মেয়ের রূপ নিয়ে কত কথা  শুনতে হয়েছে! রাজু অডিটে গিয়েছিলো প্রায় পনেরোদিন পরে ফিরেছে।একটু বিরহ কাতর তো দুজনেই ছিলো তাই  সেদিন রাতে দুজনেই যখন দুজনকে আদরে,ভালোবাসায় ভাসাচ্ছে হঠাত রেখার বুকের পাশে কিছুটা অংশ বেশ  শক্ত লাগে রাজুর।
-আঃ! করে ওঠে রেখা ।  
-কী হয়েছে?
-এইখানে একটু যন্ত্রনা মতন হয়েছে। ফোঁড়া হবে হয়তো। 

-এখানে একটা ডেলা মতন। ব্যথা নেই?
-এই কয়েকদিন ধরে ব্যথা লাগছে। 
রাজু লাইট জ্বালিয়ে দেখে। রেখার ডান দিকের স্তনবৃন্তের পাশে একটা ডেলা।চামড়ার কালার ও চেঞ্জ হয়েছে। একটা ডেলা যা রাজুর বুকে ভয়ের চোরা স্রোত বইয়ে দেয়। 
-কালকেই ডক্টরের কাছে চলো।
-মা হইনি তবু কী......
-কোন কথা  নয়।চলো ঘুমোও।
রেখাকে বুকের মধ্যে চেপে জড়িয়ে ঘুমোয় রাজু। রেখাও কেমন  অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই হাত বালিশে ঘুমোতে! 

পরেরদিন ডাক্তার দেখেন।ম্যামোগ্রাফি এবং অন্য টেস্ট  সবেতেই  ধরা পরলো ব্রেষ্ট ক্যান্সার। রেখা খুব ভেঙে পড়লো।ডাক্তারবাবু বোঝালেন,’একদিকে ব্রেষ্ট বাদ দিয়ে কেমো নিলে নর্ম্যাল  হয়ে যাবেন।‘আজকাল  কিছু ক্যান্সার সেরে যায়। তার জন্য চাই সাহস। আপনি মনের জোর হারাবেন না।
একটা মেয়ের শরীরের সবচেয়ে আকর্ষনীয় অঙ্গ বাদ দেওয়ার কথা  সহজ ভাবে নিতে পারেনা অনেকেই। রেখা নিজের থেকেও বেশী রাজুর কথা  ভাবছিলো।
-তুমি আমার জীবন, সেটা কী জানো? তোমার ব্রেষ্ট,  পার্ট অফ ইওর বডি।তুমি পাশে থাকলে আমি খুশী তে জীবন কাটাতে পারবো, রেখা । সাইকোলজি পড়েও  আমার মন বোঝো না! 

শ্বশুরবাড়িতে জানাতেই সুনামি আছড়ে পরলো।রাজুর মা- বোনেরা কেউ একজন মহিলাও রেখার জন্য কোন সহানুভূতি দেখালেন না। রাজুর মা পরিস্কার বলে দিলেন,’যাদের মেয়ে তাদের কাছে পাঠিয়ে দে। বাঁচুক, মরুক আমাদের কী! তখনই বুঝে ছিলাম অমন রোগা মেয়ে, কোন রোগ আছেই।‘
-তোমার কথা  শেষ হয়েছে? 
-কেন?
-না তাহলে ফোন রাখব। শুধু শুধু ফোনের টাকা খরচের কোন মানে হয়না।আজ যদি এই রোগ দিদিদের বা তোমার হতো?আমার বউ, আমি ট্রিটমেন্ট করাবো।
রেখা সবই শুনছিলো। ও কাঁদতে পারে না,তবু শাশুড়ির কথায় খুব আহত হয়। এই ভদ্রমহিলাকে নিয়ে কত জায়গায় বেড়াতে গেছে।নানা রকম উপহার কিনে দিয়েছে উনি চেয়েও নিয়েছেন। আর আজ কত সহজে বলে দিলেন যাদের মেয়ে তাদের বাড়ীতে পাঠা। অসময়েই  মানুষ চেনা  যায়।রেখার বাবা-মা খবর পেয়ে আসেন। টাটা  মেমোরিয়ালে নিয়ে যাওয়া হয় ওকে। সার্জারি, কেমো।একদিনের জন্য রাজুর মুখে রেখা হতাশা দেখেনি।সবসময় রেখাকে সাহস দিয়েছে, আনন্দে রেখেছে। 

কেমোর পরে চুল ঝরে যায়। কেমন ভাবে ঝরে? বালিশ থেকে মাথা ওঠালে দেখা যায় বালিশেই চুল, অল্প কিছু চুল নিয়ে সে উঠেছে।এই চুল রেখার খুব আদরের ছিলো। মাথা পুরো ন্যাড়া করে  নিলো রেখা ,রোজ রোজ চুল ঝরে যাওয়া দেখলে নিজেকে  আরও  দুর্বল  লাগে।এখনো কিছুদিন রেখাকে মুম্বইতে থাকতে হবে। বাবা-মা চলে যান কারন ঠাকুমা বাড়িতে একা। কিছু একটা আন্দাজ করেই রেখার জন্য একটা মহাভারত পাঠিয়েছেন ওর ঠাকুমা।  রাজুর সাথে ওর বাড়ীর সম্পর্ক টাকা-পয়সায় দাঁড়িয়ে আছে। ও মাস গেলেই এক থোক টাকা পাঠিয়ে দেয়। 

সেদিন সকালে রেখা যার অধীনে চিকিৎসায় আছে সেই ডক্টর  এসে বললেন,’কেমন আছেন?’
-আমি কী বাড়ী যেতে পারি!
-ও সিওর! হোয়াই নট। বাড়ী  গিয়ে নিয়ম করে ওষুধ খাবেন, মেডিটেশন ইজ মাস্ট। থিংক পজিটিভ ম্যাম।
-আমার হাজবেন্ড কী এসেছেন?
-হ্যাঁ! উনি খুব মন দিয়ে সব কিছু বুঝে নিচ্ছেন। ইউ আর ভেরি লাকি।
লাকিদের বুঝি এমন অসুখ হয়!
এখানে কত নাটক দেখি ম্যাম। স্ত্রীর ব্রেষ্ট ক্যান্সার সার্জারি করাবে না। ওর তো সৌন্দর্যই চলে যাবে। ভাবুন। বউএর প্রানের থেকেও সৌন্দর্য বড়।কত রকমের স্বামী দেখি। আপনার জনটি রিয়েলী ডিফারেন্ট। 

দূরে করিডর ধরে রাজুকে আসতে দেখা যায় কিন্তু একী!
-এটা কী করলে?
-কী করলাম? আইডেন্টিকাল টি-শার্ট পড়ি, জুতো পড়ি আর আইডেন্টিকাল হেয়ার কাট না করলে চলে! এখন বল্ড হেয়ার ফ্যাশনে ইন। তাই বাদ দিলাম। আমায় কেমন লাগছে?
- রেখার দুচোখে আনন্দের জল। ও রাজুর ন্যাড়া মাথায় চুমু খেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে। 

এবার  বাড়ীতে তো চলো।কেমো নিয়ে রেখা দুর্বল হয়ে  গেছে। হোয়াইট ব্লাড কাউন্ট কমে গেছে, প্লেটলেট কমে গেছে।  ঝড় চলে গেছে এখন রেখা আর রাজুকে নতুন করে সব শুরু করতে হবে। রাজু হুইল চেয়ার ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যায় রাকা কে হাসপাতাল থেকে দূরে, এক নতুন জীবনে।
সত্যিকারের ভালোবাসার  শক্তি অপরিসীম  যা সব রকম বিপদকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নরক যন্ত্রণার মধ্যে স্বর্গের সুখ নিয়ে আসে - অনিত্য মানব জীবনের এটাই তো সব থেকে বড় পাওয়া।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।