দেশভাগের নেপথ্য কাহিনী

আজকের যে ভারতবর্ষে আমরা বাস করি সেটা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। কিন্তু এটা আগে এরকম ছিল না। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ও ফরাসি মিত্রদের সাথে ব্রিটিশ ইস্ট কোম্পানির পলাশী নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তাই পলাশীর যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৭৫৭ সালের জুন ২৩ তারিখে এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়। এই যুদ্ধ ভারতে ইংরেজ শক্তির ক্ষমতা প্রদর্শন ও তারা আমাদের শাসক হিসাবে প্রবেশ সূচিত করেছিল।এইভাবেই বনিকের মানদন্ড দেখা দেয় রাজদন্ড রূপে।
14-15 আগস্ট, 1947-এ ব্রিটিশ সরকার যে ভারতকে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি পৃথক রাজ্যে বিভক্ত করে – এটি ছিল “শেষ মুহূর্তের” প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্রিটিশরা কীভাবে স্বাধীনতা সংঘটিত হবে তা নিয়ে চুক্তি নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছিল । সেই সময়ে, হাতে গোনা খুব কম লোকই বুঝতে পেরেছিল যে ভাগ করার পরে কী হবে বা এর ফলাফল কী হবে ভবিষ্যতে, এবং আগামী দিনে বিপুল পরিমাণে অভিবাসন সমসাময়িকদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে অবাক করে দিয়েছিল।
তখন স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের প্রধান বাহন ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, যার সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত নেতারা ছিলেন মহাত্মা গান্ধী এবং জওহরলাল নেহেরু । এমনকি 1940 এর আগে, এটি একটি শক্তিশালী কেন্দ্রের সাথে একটি একক রাষ্ট্রের পক্ষে দীর্ঘকাল ধরে যুক্তি দাঁড় করিয়েছিল ; যদিও কংগ্রেস তার উদ্দেশ্যগুলিতে স্পষ্টতই ধর্মনিরপেক্ষ ছিল, সংখ্যালঘু স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলি এই ধারণাটিকে ক্রমবর্ধমানভাবে সন্দেহের চোখে দেখছিল এবং তারা বিশ্বাস করতো যে অখন্ড ভারতে হিন্দুরা তাদের নিজের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করবে, যারা জনসংখ্যার প্রায় ৮০%ছিল ।মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫%, মুসলমানরা ছিল ব্রিটিশ ভারতের বৃহত্তম ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমাজ । সাম্রাজ্য শাসনের অধীনে, তারা সংরক্ষিত আইনসভা আসন এবং পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা দ্বারা তাদের সংখ্যালঘু মর্যাদা সুরক্ষিত রাখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ব্যবস্থাটি বাঁচিয়ে রাখতে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক লাভবান স্বার্থবাদী গোষ্ঠীগুলিকে চিহ্নিত করার উপর নির্ভরশীল ছিল , কারণ একটি শাসক শৈলী প্রায়শই “বিভক্ত করুন এবং শাসন করুন” হিসাবে বর্ণনা করা হয়।
আমরা জানি, ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লিগের সভায় পাকিস্তান প্রস্তাব গৃহীত হয়। তবে ব্রিটিশ সরকার শুরুতে ভারতভাগের বিরোধী ছিল, কারণ তাদের প্রধান মাথাব্যথা ছিল যে দেশভাগ হলে মিশ্র জনবসতি এলাকার মানুষদের কী হবে। এমতাবস্থায় ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৬ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এক ক্যাবিনেট প্রতিনিধিদল বা Cabinet Mission পাঠাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মিশনের মুখ্য কাজ ছিল— (১) স্বায়ত্তশাসিত ভারতের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা, (২) দেশ চালনার উদ্দেশ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা। ১৯৪৬-এর ১৬ মে ক্যাবিনেট প্রতিনিধিদল একটি বিবৃতি জারি করে বলেন যে তাঁরা পৃথক পাকিস্তানের প্রস্তাব মানছেন না এবং এক অবিভক্ত ভারতের জন্য এক ত্রিস্তরীয় সংবিধান রচনা করেছেন, যাতে সংখ্যালঘুদের জন্যও সুরক্ষাকবচ দেওয়া থাকবে, যার মৌলিক ভিত্তি হবে এই দলিল। গান্ধিজি ওই প্রস্তাবকে ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রেষ্ঠ দলিল’ বলে অভিহিত করলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা মহম্মদ আলি জিন্নাকে খুশি করল না। তবে ইচ্ছেয় হোক, অনিচ্ছাতেই হোক, মুসলিম লিগ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাবকে মেনে নেয় এবং এ ব্যাপারে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের বাতাবরণ গড়ে ওঠে। ১৯৪৬-এর ২৫ জুন তারিখে ক্যাবিনেট মিশন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের প্রতিনিধিদের ডাকলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ব্যাপারে আলোচনার জন্য,তবে সেখানে বাদ দেওয়া হলো গান্ধীকে।
এরপর ঘটল এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।১৯৪৬সালের ১০ জুলাই তারিখে জওহরলাল নেহরুকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করলেন, কংগ্রেস কি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠনতন্ত্র-সহ ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব পুরোপুরিভাবে মেনে নিয়েছে। নেহরু উত্তরে বলেন যে কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগ দিতে সম্মত হয়েছে, কিন্তু সরকারে ক্যাবিনেট মিশনের শর্তাবলি কংগ্রেস তার ইচ্ছেমত ঠিক করে নেবে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ‘India Wins Freedom’ গ্রন্থের এক জায়গায় লিখেছেন, নেহরুর এই ঘোষণা জিন্নার সামনে যেন একটা বোমা-বিস্ফোরণ ঘটালো। অতঃপর মুসলিম লিগ ২৭ জুলাই একটা অধিবেশন ডেকে ক্যাবিনেট মিশনের পরিকল্পনাকে অগ্রহণীয় বলে ঘোষণা করলেন । কংগ্রেস তড়িঘড়ি একটা বিবৃতি জারি করে নেহরুর নাম না করে নেহরুর বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করল। কিন্তু এতে চিঁড়ে ভিজল না, কো সুরাহা হলো না । মুসলিম লিগ তাদের পরিবর্তিত অবস্থানেই অনড় রইল।এরপরেই এল ১৬ আগস্ট পাকিস্তানের দাবিতে শুরু হলো মুসলিম লিগের ডাকা সেই Direct Action Day বা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস। ১৯৪৬-এর ৮ নভেম্বর তারিখে নোয়াখালীর দত্তপাড়ায় এক জনসমাবেশে বাপুজী বললেন, ‘যদি ভারতের ভাগ্যাকাশে দেশভাগ লেখা থাকে, আমি তা ঠেকাতে পারবো না। কিন্তু আপনাদের আমি বলতে চাই যে হিংসার মাধ্যমে পাকিস্তান আদায় করা যাবে না।’ জনসভায় উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই ছিল মুসলিম ধর্মাবলম্বী (সূত্র: গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর লেখা ‘A Frank Friendship: Gandhi and Bengal— A Descriptive Chronology’ গ্রন্থ )। ১৯৪৭ সালের ১৫ জানুয়ারি তারিখে নোয়াখালীর ভাটিয়ালপুরে কিছু মুসলিম যুবক বাপুকে জিজ্ঞেস করেন যে পাকিস্তানের দাবি মানা সাপেক্ষেই পুরো ভারতের স্বাধীনতা পাওয়াটা ঠিক হত না কি? গান্ধিজি তাঁদের বলেন, ‘‘যখন তোমরা প্রথমে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার কথা ভাবো, তখন তাকে কোন তৃতীয় শক্তির সুবাদে পাওয়ার কথা ভাবো। আমি যখন ভারতের স্বাধীনতার কথা ভাবি, তখন আমি তা কোনও রকম বিদেশি শক্তির সাহায্য ছাড়াই নিজেদের শক্তিতে অর্জন করার কথা ভাবি। একবার স্বাধীনতা অর্জিত হয়ে গেলে, তার পর আমরা অখণ্ড হিন্দুস্তান বা পাকিস্তান বিষয়গুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারি।’’ (সূত্র: গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর লেখা ‘A Frank Friendship: Gandhi and Bengal— A Descriptive Chronology’ গ্রন্থ)।
স্বাধীনতার সাথে সাথে এই সুরক্ষা হারানোর সম্ভাবনা আরও বেশি করে মুসলমানদের উদ্বিগ্ন করে তোলে, প্রথমে উত্তর ভারতের কিছু অংশে এবং তারপরে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে, প্রভাবশালী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বাংলা এবং পাঞ্জাবের মধ্যে।
1945-46 সালে, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রাদেশিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভোটে জয়লাভ করে।এটি তখন উপমহাদেশের মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য অনুপাতের পক্ষে কথা বলার জন্য পার্টির দাবিকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে ছিল , কিন্তু কখনই সেটা হয় নি ।
এরপরই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় – এবং তখন হঠাৎ করেই, ভারতে রাজনৈতিক দাপট অনেক বেশি বেড়ে চলে।
1939 সালে পরামর্শ ছাড়াই ব্রিটেন ভারতকে যুদ্ধে নিয়ে গেলে কংগ্রেস তার বিরোধিতা করে এবং এরজন্য বৃহৎ জাতীয়তাবাদী বিক্ষোভ শুরু হয়, যা 1942 সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে পরিণত হয়, যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একটি স্বতস্ফূর্ত গণআন্দোলন। এতে তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য ও আন্দোলনকে ভেঙ্গে দেবার কারণে গান্ধী ও নেহেরু এবং কংগ্রেসের হাজার হাজার কর্মীকে 1945 সাল পর্যন্ত কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ যুদ্ধকালীন স্থানীয় মিত্রদের প্রয়োজনীয়তা মুসলিম লীগকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সুরক্ষার বিনিময়ে সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছিল। 1940 সালের মার্চ মাসে, মুসলিম লীগের “পাকিস্তান” রেজোলিউশনে ভারতীয় মুসলমানদের থাকার জন্য “পৃথক রাষ্ট্র” – বহুবচন, একক নয় – গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছিল, যাদেরকে এটি একটি পৃথক “জাতি” বলে দাবি করেছিল।
বিশ্বযুদ্ধের পর, লন্ডনে এটলির শ্রম সরকার স্বীকার করে যে ব্রিটেনের বিধ্বস্ত অর্থনীতি অতিরিক্ত সম্প্রসারিত সাম্রাজ্যের খরচের সাথে মানিয়ে নিতে পারে না। 1946 সালের প্রথম দিকে একটি ক্যাবিনেট মিশন ভারতে পাঠানো হয়েছিল এবং এটলিকে তার মিশনকে উচ্চাভিলাষী শর্তে বর্ণনা করেছিলেন:
“আমার সহকর্মীরা তাকে যত দ্রুত সম্ভব এবং সম্পূর্ণরূপে তার স্বাধীনতা অর্জনে সাহায্য করার জন্য তাদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যবহার করার অভিপ্রায় নিয়ে ভারতে যাচ্ছে। বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে কোন ধরনের সরকার প্রতিস্থাপন করবে তা ভারতের সিদ্ধান্ত নিতে হবে; কিন্তু আমাদের ইচ্ছা হল তাকে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দ্রুত যন্ত্রপাতি স্থাপনে সাহায্য করা।”
সংসদের একটি আইন 1948 সালের জুনকে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়সীমা হিসাবে প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু মিশন তার প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পরিকল্পনার বিষয়ে চুক্তি নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা একটি শিথিল ফেডারেশনের সুপারিশ করেছিল; এই ধারণাটি কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ উভয়ই প্রত্যাখ্যান করেছিল, যারা সম্ভাব্য যেকোনো উপায়ে “পাকিস্তানের” জন্য আন্দোলন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ।
অতঃপর ১৯৪৭ সালের ২৪ মার্চ তারিখে ভাইসরয় হিসেবে ভারতশাসনের দায়িত্ব নেন লর্ড মাউন্টব্যাটেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নির্দেশ দেয় যে জুন ১৯৪৮-এর মধ্যে ভারতীয়দের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ সম্পন্ন করতেই হবে। চতুর মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের ব্যাপারে নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেল দু’জনকেই রাজি করিয়ে ফেললেন, এবং সেটা এতটাই যে তাঁরা দুজন দ্বিজাতিতত্ত্বের ব্যাপারে ‘জিন্নার চেয়েও বড় সমর্থক হয়ে গেলেন।’ বাপু এটা শুনে মৌলানা আজাদকে বললেন, ‘‘কংগ্রেস যদি দেশভাগের প্রস্তাব গ্রহণ করে, তবে তা হবে আমার মৃতদেহের উপর।’’ রামমনোহর লোহিয়া জানিয়েছেন যে তাঁকে না জানিয়েই নেহরু ও প্যাটেল দেশবিভাগের পরিকল্পনায় সম্মতি দেওয়ায়, পরবর্তী এক সময়ে গান্ধীজি সঙ্গে নেহরুর বাদানুবাদও হয় (সূত্র: The Guilty Men of Partition ‌by Ram Manohar Lohia, বঙ্গানুবাদ: সজল বসু)। এ রকম কোনও একটা সময়ে মাউন্টব্যাটেন নাকি সদম্ভে বলেছিলেন, ‘‘কংগ্রেস এখন আমার সঙ্গে আছে, গান্ধিজির সঙ্গে নেই।’’
সব সময় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েই চলেছে। 1946 সালের আগস্টে, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং প্রায় ৪,০০০ মানুষ মারা যায় এবং আরও ১০০,০০০ গৃহহীন হয়।
1947 সালের মার্চের মধ্যে, একজন নতুন ভাইসরয়, লর্ড লুই মাউন্টব্যাটেন, ব্রিটিশ রাজের অবসান ঘটানোর জন্য একটি দ্রুত উপায় খুঁজে বের করার জন্য একটি আদেশ নিয়ে দিল্লিতে আসেন । 3 জুন, তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে স্বাধীনতা সেই বছরের আগস্টে এগিয়ে আনা হবে, রাজনীতিবিদদের একটি আল্টিমেটাম দিয়ে উপস্থাপন করে যা তাদের দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনে সম্মত হওয়া ছাড়া সামান্য বিকল্প দেয়।
১৯৪৭-এর মার্চে মাউন্টব্যাটেন বাপু ও জিন্নাকে নিয়ে এক বৈঠক করেন। বাপু তাঁকে বলেন জিন্নাকে সরকার গঠন করার জন্য ডাকতে। কিন্তু নেহরু ও প্যাটেল এই প্রস্তাবে অসম্মত হন। এদিকে এর পরবর্তী ২ এপ্রিল প্যাটেলের সঙ্গে এক বৈঠকের পর বাপুর মতও আশ্চর্যজনক ভাবে পাল্টে যায়। ক্ষুব্ধ মৌলানা আজাদ এই মতপরিবর্তনের প্রতিবাদ করলে বাপু বলেন,আমি তো মাউন্টব্যাটেনকে বলেছি জিন্নাকে সরকার গড়ার জন্য ডাকতে।৬ মে ১৯৪৭-এ অরুণা আসফ আলি ও অশোক মেহতাকে বাপু বলেন, ‘‘কংগ্রেসের কখনওই দেশভাগের শরিক হওয়া উচিত নয়। আমাদের ব্রিটিশকে নিঃশর্তভাবে ভারত ছেড়ে চলে যেতে বলা উচিত… যেটাকে আমরা অশুভ বলে জানি, কেন আমরা সেটার শরিক হতে যাব?’’ (সূত্র: ব্যারাকপুর গান্ধী মিউজিয়াম কর্তৃক প্রকাশিত Gandhi News পত্রিকার অক্টোবর, ২০২১ সংখ্যায় বিমল প্রসাদের লেখা প্রবন্ধ)। ১৯৪৭-এর ৩১ মে তারিখে বাপু রাজেন্দ্র প্রসাদকে বলেন যে আগে শান্তি প্রতিষ্ঠা না করে দেশভাগ করলে, সেটা হবে আত্মঘাতী (সূত্র: ব্যারাকপুর গান্ধী মিউজিয়াম কর্তৃক প্রকাশিত Gandhi News পত্রিকার অক্টোবর, ২০২১ সংখ্যায় বিমল প্রসাদের লেখা প্রবন্ধ)।
শেষে ১৪ জুন ১৯৪৭ তারিখে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি বা এআইসিসি মাউন্টব্যাটেনের ভারত-ভাগের পরিকল্পনাকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। পরে গান্ধীজিও এ বিষয়ে তাঁর অনুমোদন প্রদান করেন (‘‘I must swallow the bitter pill’’), কারণ কংগ্রেস ইতিমধ্যেই তাদের এমত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে ও সারা বিশ্বকে তা জানিয়ে দিয়েছে। ভগ্নহৃদয় বাপু বলেন, ‘‘আমার সুদীর্ঘ প্রয়াস আর ৩২ বছরের সংগ্রাম লজ্জার মধ্যে দিয়ে শেষ হল।’’ (সূত্র: The Life of Mahatma Gandhi by Louis Fischer)।
আচার্য জেবি কৃপালনি লিখেছেন, ‘‘জুন ১ তারিখে গান্ধিজি প্রভাতী প্রার্থনার সময়ের অনেক আগে উঠে পড়লেন এবং পেয়ারিলালের বিবরণ অনুযায়ী, বাপুকে বিছানায় শুয়ে বিলাপ করতে শোনা গেল , ‘‘আমি আজ একা। এমনকি সর্দার আর নেহরুও মনে করে যে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার বিশ্লেষণ ভুল এবং একবার দেশভাগ হলে শান্তি আসতে বাধ্য… আমি যে ভাইসরয়কে বলেছি যে দেশভাগ হলেও সেটা ব্রিটিশের মাধ্যমে অথবা ব্রিটিশ শাসনের অধীনে হওয়া কাম্য নয় সেটাও তাদের অখুশি করেছে…, তারা ভাবছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার অবক্ষয় ঘটেছে। তবুও, আমি যা ভাবি সেটা বলবোই…,আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আমরা ভুল রাস্তায় চলেছি। আমরা হয়তো এখনও আসন্ন প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি টের পাচ্ছি না। কিন্তু আমি খুব ভালো মতো এই ভাবে পাওয়া স্বাধীনতার অন্ধকারময় ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি।…তবে হতেও পারে তারা সবাই ঠিক, আর আমি একাই শুধু অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছি। সম্ভবত আমি এটা দেখার জন্য আর বেঁচে থাকবো না। কিন্তু যে অশুভের আশঙ্কা আমি করছি তা যদি ভারতকে গ্রাস করে এবং স্বাধীনতা বিপন্ন হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন জানতে পারে কী মনোবেদনার মধ্যে দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে। এটা যেন বলা না হয় যে ভারতের দেহচ্ছেদে গান্ধীজিও একজন শরিক ছিলেন। কিন্তু সবাই এখন স্বাধীনতার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছে। তাই সামনে আর কোন রাস্তাই নেই’’ (সূত্র: Gandhi: His Life and Thought by by J. B. Kripalani)
প্রশ্ন হল, দেশভাগ কি তাহলেই অনিবার্যই ছিল? এখন বলি, কিছু পদক্ষেপের কথা, যা গ্রহণ করলে হয়তো দেশভাগ ঠেকানো যেত।কংগ্রেসের সরকার গঠন প্রত্যাখ্যান-১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে বাঙালি প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। কংগ্রেস ৬০ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু তা সরকার গঠনে যথেষ্ট ছিল না। সারা বাংলায় একে ফজলুল হকের একক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকায় তাকে বাংলার গভর্নর মন্ত্রিসভা গঠন করতে বলেন। তার দল কৃষক প্রজা পার্টির আসন ছিল ৩৮। ফজলুল হল চান কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন সরকার করতে। কিন্তু কংগ্রেস এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে। যদিও বঙ্গীয় কংগ্রেসের শরৎ বসু রাজি ছিলেন কিন্তু নেহেরুদের বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি।এতে দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস শুধু মুসলিম লীগের বিরোধী ছিল না, বাংলায় হিন্দু মুসলিম (কংগ্রেস-মুসলিম লিগ) যৌথ সরকার গঠনেও তারা অনাগ্রহি ছিল।একই ঘটনা ঘটে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনে। সেখানে মুসলিম লিগ ও কংগ্রেসের কোয়ালিশন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেহেরু কর্তৃক নাকচ হয়ে যায়।সুতরাং ব্রিটিশ ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম কংগ্রেস-মুসলিম লিগ সমঝোতা ও যৌথ সরকার হবার যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল, তা বাস্তবে হলে আজকের দেশভাগ নাও হতে পারত। কারণ এই সমঝোতা থেকে পরবর্তী কালে হয়তো তাদের মধ্যে মিত্রতা তৈরি হতে পারত।হিন্দু মহাসভার ঘোষণা-মুসলিম লীগের আগে হিন্দু মহাসভাই প্রথম তাদের এক অধিবেশনে প্রথম ঘোষণা দেয় যে, হিন্দু জনজাতি ভারতের আদি অধিবাসী ও তারা মুসলিম হতে আলাদা। যতীন সরকারের এক নিবন্ধমতে,হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৩৮-এর ডিসেম্বরে মহাসভার নাগপুর অধিবেশনে বলেন, ‘উই দি হিন্দুজ আর অ্যা নেশন বাই আওয়ারসেলভ্স’। অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক মিলের বিপরীতে ধর্মীয় তত্ত্ব হাজির করে তারা।জিন্নার দ্বিজাতিতত্ত্ব সবদিক থেকে পিছিয়ে থাকা মুসলিম জনগণকে একত্র করতে পেরেছিলেন জিন্না তার টু নেশান থিওরি দিয়ে। যখন তিনি দেখলেন, কংগ্রেস কিংবা হিন্দু মহাসভা অথবা ভারতবর্ষের জনমত- সবটাই তাঁর রাজনৈতিক সুবিধার বিপরীতে চলে যাচ্ছে, তখনই তিনি আনলেন এই তত্ত্ব, ঘোষিত হল ১৯৪০ সালে।মন্ত্রীমিশন ও দাঙ্গা ১৯৪৬ সালে সংগঠিত দাঙ্গা দেশভাগকে অনিবার্যতা ও দ্রুততার দিকে নিয়ে যায়।ক্যাবিনেট মিশন সে বছর ভারতের ওপর শাসনপ্রক্রিয়া তুলে দেবার পরিকল্পনা করে। শুরুতে মুসলিমপ্রধান মুসলিম লীগ ও হিন্দুসমর্থক কংগ্রেসকে কিছু যৌথ প্রস্তাব দেয়া হয়। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শাসনের সমণ্বয় ও সমবণ্টনের ভিত্তিতে ক্লিমেন্ট এটলি এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। একটি প্রস্তাব ছিল, যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতে থাকবে মুসলিম ও হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে আলাদা প্রদেশ এবং বাংলা ও আসামপ্রদেশ। কিন্তু কংগ্রেস এই সাম্প্রদায়িক প্রস্তাব আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। পরে ব্রিটিশ সরকার আশ্বাস দেয়, অন্তর্বর্তী সরকারে কংগ্রেস সংবিধান রচনায় স্বাধীনতা পাবে। এই স্বাধীনতা ব্যবহার করে কংগ্রেস নিজ ইচ্ছামত ও মুসলিম লীগের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নেবে- এমন আশঙ্কায় ভারতজুড়ে হরতালের ডাক দেয় মুসলিম লীগ। ফলে দেশব্যাপী ঘটে দাঙ্গা। প্রথমে কলকাতায়, পরবর্তীতে ভারতের অন্যান্য স্থানে।এখন প্রশ্ন আসে, দেশভাগে কার বেশি দায় ছিল, কংগ্রেস নাকি মুসলিম লিগের?দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানই আসলে দায়ী। নেহেরু বলেছিলেন, ভারতবর্ষ একজাতির দেশ কিন্তু বুঝিয়েছেন হিন্দুজাতিকেই। তার প্রতিক্রিয়াতেই জিন্না বলেছেন ভারতে আসলে দুই জাতি, হিন্দু এবং মুসলিম। কাজেই দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল একটি প্রতিক্রিয়া। তাই জিন্নাও তার দাবিতে ছিলেন অটল।তারপরেও দ্বিজাতি বাদে একত্র থাকবার সুযোগ থেকে গিয়েছিল, ১৯৪৭সালে।ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ব্রিটিশরা সেবছর অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি করে, যাতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর নেন কংগ্রেসের সরদার প্যাটেল কিন্তু তিনি তার দলের ইচ্ছেমত কোন কাজই বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না। এর কারণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান। লিয়াকতের অনুমোদন ছাড়া কোন কাজ করা যাচ্ছিল না। সুতরাং এই অন্তর্বর্তী যৌথ সরকারেই পরিষ্কার হয়ে গেল, কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ প্রকৃত অর্থে যৌথভাবে কাজ করতে পারবে না।নেহেরু, সরদার প্যাটেল, মৌলানা আজাদ, গান্ধী- এই চারজন ছিলেন কংগ্রেসের প্রধান নেতা।ব্রিটিশদের ক্ষমতা ছাড়ার কিছুদিন আগে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে গান্ধী প্রস্তাব করেছিলেন, জিন্নাকে অখন্ড ভারতবর্ষের প্রধান করা হোক, তাহলে হয়তো ভারতভাগ ঠেকানো যাবে। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড় দিতে হয়। ভারতবর্ষ অখন্ড রাখার স্বার্থে নেহেরু, প্যাটেলদের ছাড় দিতে হত।কিন্তু কিছুদিন আগের অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতায় তারা সেটা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের মনোভাব হয়তো এমন ছিল, জিন্না কোন ছাড় দিচ্ছেন না, আমরা কেন ছাড় দেব?সুতরাং গান্ধী বলতে বাধ্য হন, ভারতভাগ অনিবার্য। আর মৌলানা আজাদ অত্যন্ত হতাশ হলেন তাদের ক্ষমতালোভের প্রতি। তার ভাষায়, মহম্মদ আলী জিন্না হয়তো ভারত ভাগ করার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, কিন্তু প্যাটেল সে পতাকা বহন করছেন। কোন পক্ষেরই ছাড় না দেয়ার মানসিকতা থেকে প্রমাণ হল, অখন্ড ভারত নয়, নেহেরু জিন্নাদের কাছে ক্ষমতাই আসল উদ্দেশ্য।এদিকে দেশভাগের পর দুইবাংলা এক থাকার সম্ভাবনা থেকে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে।কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু কংগ্রেসি নেতারা সবাই একবাক্যে হিন্দুপ্রধান ভারতের সাথে থাকতেই সায় দেন। একই পথে হাঁটে আসামও। যার কারণে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎবসুর উদ্যোগে ১৯৪৭ সালে যুক্তবাংলার এক প্রস্তাব শুরুতেই ভেস্তে যায়। ১৯৩৭ সাল থেকে বাঙলায় হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় না আসা এর যেমন একটি কারণ, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সাথে যুক্ত হলে একটি হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার গঠনের সহজ ও সুবর্ণ সম্ভাবনা- এ দুকারণে দুই বাংলা চিরকালের মত রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
পাকিস্তান – তার পূর্ব এবং পশ্চিম অংশগুলি প্রায় ১,৭০০ কিলোমিটার ভারতীয় ভূখণ্ড দ্বারা বিভক্ত – সেই বছর ১৪ আগস্ট স্বাধীনতা উদযাপন করেছিল ; পরের দিন ভারত তাই করল। নতুন সীমানা, যা পাঞ্জাব এবং বাংলার প্রধান প্রদেশগুলিকে দুটি ভাগে বিভক্ত করেছিল, ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল৷ সেগুলি ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফের নেতৃত্বে একটি সীমানা কমিশন দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল, যিনি পরে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি নির্ভর করেছিলেন -তারিখের মানচিত্র এবং আদমশুমারির উপকরণ।
বিভাজন দাঙ্গা, ব্যাপক প্রাণহানি এবং অভিবাসনের এক বিশাল ঢেউ শুরু করে । মুসলমানরা পাকিস্তানের দিকে এবং হিন্দু ও শিখরা ভারতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে লক্ষ লক্ষ লোক তাদের নিরাপদ অঞ্চলের আশায় চলে গিয়েছিল। প্রায় ১৪ - ১৬ মিলিয়ন মানুষ শেষ পর্যন্ত বাস্তুচ্যুত হয়েছে, পায়ে হেঁটে, গরুর গাড়িতে এবং ট্রেনে ভ্রমণ করছে।
দেশভাগের পরে মৃতের সংখ্যার অনুমান ২০০,০০০ থেকে দুই মিলিয়ন পর্যন্ত। অনেকে অন্য সম্প্রদায়ের সদস্যদের দ্বারা এবং কখনও কখনও তাদের নিজের পরিবারের দ্বারা, সেইসাথে শরণার্থী শিবিরের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক রোগের দ্বারা নিহত হয়েছিল । নারীদের প্রায়ই সম্প্রদায়ের সম্মানের প্রতীক হিসেবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়, যেখানে ১০০,০০০ পর্যন্ত ধর্ষণ বা অপহরণ করা হয়।
বাংলার যে হিন্দু ও মুসলিমরা ১৭৫৭তে পলাশির যুদ্ধে, ১৮০০তে ফকিরসন্নাসি বিদ্রোহ ও ১৮৫৭তে সিপাহি বিদ্রোহে মিলেমিশে অংশ নিয়েছে, সেই তারাই এক শতাব্দীর ব্যবধানে আলাদা হয়ে যায়।এই প্রসঙ্গে কয়েকটি প্রশ্ন থেকে যায় :-
১. ব্রিটিশ কর্তৃক বঙ্গভঙ্গ এবং তৎপরবর্তি স্বদেশি আন্দোলনে হিন্দুত্ববাদিতার প্রাধান্য:
ইংরেজরা প্রশাসনিক সুবিধা হবে দেখিয়ে বাংলাকে দুইভাগ করে। তাদের কথায় সত্যতা আছে ঠিকই। কিন্তু এটা যে অনিবার্যভাবে তাদের ঔপনিবেশিক শাসন আরো দীর্ঘস্থায়ি করার প্রক্রিয়া সেটাও মানতে হয়। কারণ এ পদক্ষেপের ফলে হিন্দু মুসলিম বৈরিতা আরো বেড়ে যায়। দুইপক্ষ এটিকে নেয় দুইভাবে। তবে তাদের দিক থেকে চিন্তা করলে সেটা অযৌক্তিকও নয়।শিক্ষা, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক দিক থেকে মুসলিমরা পিছিয়ে পড়ে, কাজেই তারা চাইবে এসবে উন্নত হতে। তখন তাদের কাছে আশার আলো হয়ে দেখা দেয় বাংলার রাজনৈতিক বিভাজন। আশা এই যে, ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাড়বে অর্থনীতির চাকা, নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সহজে শিক্ষা নিতে পারবে মুসলিমরা আর পশ্চিমের হিন্দু জমিদারিতেও বাংলার গরিব মুসলিমদের আর নিষ্পেষিত হতে হবে না। কিন্তু হিন্দু জমিদার, শিক্ষিত ও ব্যবসায়ি ও রাজনীতিকরা এর বিরোধিতা করে।এখানে লক্ষণীয়, বঙ্গভঙ্গকে দুপক্ষের দুইভাবে নেয়াতে তাদের নিজস্ব স্বার্থের দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।তবে বঙ্গভঙ্গ পরবর্তিতে মূলত হিন্দু সম্প্রদায় দ্বারা পরিচালিত তীব্র আন্দোলনে বন্দে মাতরাম ধ্বনি, গীতা ছুঁয়ে শপথগ্রহণ, রাখীবন্ধন অনুষ্ঠান, হিন্দু বিপ্লবী দ্বারা গঠিত যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতি ইত্যাদি বাংলার হিন্দু আর মুসলিমকে একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। দুই বাংলা এক করার মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিন্দুরা যেন ক্রমেই নিজেদের হিন্দুত্ববাদিতার পরিচয় ও মুসলিম বিদ্বেষ স্পষ্ট করে তোলেন।
২. মুসলিম লীগ গঠন:এটি ছিল বঙ্গভঙ্গ পরবর্তি স্বদেশি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া। স্বদেশি আন্দোলনে যেমন সারা বাংলার হিন্দুরা একাত্ম হয়ে ওঠে, তেমনি এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি সারা ভারতের মুসলমানদের একত্র করার একটি উপলক্ষ। বলা হয়, কংগ্রেসের সৃষ্টি ছিল আড়াআড়ি বিভাজন (শ্রেণিগত বিভাজন), আর মুসলিম লিগের সৃষ্টি হল একেবারে খাড়াখাড়ি বিভাজন (সাম্প্রদায়িক বিভাজন)। কারণ কংগ্রেস ছিল ভারতীয় মধ্যবিত্তের একটি দল, যা দরিদ্র শ্রেণি থেকে নিজেদের পৃথক রেখেছে। পক্ষান্তরে মুসলিম লিগ গঠন ভারতের হিন্দু সম্প্রদায় থেকে নিজেদের পৃথক করার চেষ্টা।কিন্তু তার মানে কি মুসলমানেরা নিজেদের অধিকার আদায়ে দল গঠন করবে না? এখানেও চলে আসে আগের বৈষম্যের কথা, যা অনেকটা চেইন রিএকশনের মত। হিন্দু মুসলিম বৈষম্য, তারপর মুসলিমদের শোষণ করতে হিন্দু পুঁজিপতিদের প্রতিক্রিয়া (জাতীয়তাবাদিদের অস্বীকার করছি না) তারপর মুসলিম লিগ গঠন।তবে এখানে বলতে হয়, ১৮৭৫সালে মহামেডান এংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠা বা আলিগড় আন্দোলনের মাধ্যমেই উত্তর ভারতে স্যার সৈয়দ আহমদ খান ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা গড়ে তুলতে সমর্থ হন। সেটি ছিল সূচনা, মুসলিম লিগ ছিল পরিণতি।
৩. কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ, দুইপক্ষের ক্ষমতার রাজনীতি:
কংগ্রেসের অনমনীয় মনোভাব দেখা যায় বেঙ্গল প্যাক্ট প্রত্যাখ্যান ১৯২৩, জিন্নার ১৪দফা প্রত্যাখ্যান ১৯২৯। মওলানা আবুল কালাম আজাদের মতে ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্যাক্ট প্রত্যাখ্যান এবং যশোবন্ত সিং এর মতে ১৯২৯ সালে জিন্নাহর ১৪দফা প্রত্যাখানের মাধ্যমে জিন্নাহ বনাম নেহেরু বিরোধই মূলত দেশভাগের রাজনৈতিক সূচনা।এখন দেখি দুই রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য কি ছিল।কংগ্রেস সবসময় চেয়েছে অবিভক্ত ভারত। সন্দেহ নেই, সবাইকে একত্রে রাখতে এটি অতি মহৎ উদ্দেশ্য। কিন্তু উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল। অবিভক্ত ভারতে স্বভাবতই হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই কংগ্রেস চেয়েছে হিন্দু অধ্যুষিত অখন্ড ভারতে ক্ষমতা থাকবে তাদের হাতে। তারা মূলত হিন্দুস্বার্থই দেখেছে, এর প্রমাণ জিন্নাহর ১৪দফা তারা মেনে নেয়নি। এই দফাগুলোয় ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন ও তিনভাগের একভাগ আসন সংরক্ষণ, চাকরিতে মুসলিমদের জন্য কোটা ইত্যাদি। এমনকি তারও আগে ১৯২৩সালে কংগ্রেস বেঙ্গল প্যাক্ট প্রত্যাখ্যান করে চিত্তরঞ্জন দাশকে সুবিধাবাদি ও মুসলিম স্বার্থরক্ষাকারি হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। কংগ্রেস ছিল দিল্লিভিত্তিক এককেন্দ্রিক শাসনের পক্ষপাতি, তাই বাংলার স্বতন্ত্র প্রাদেশিক নির্বাচন তারা মেনে নেয়নি (যদিও পরবর্তিতে তারা ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয়)।পক্ষান্তরে, মূলত ১৯২৯ সাল পর্যন্ত জিন্নাহ কোনমতেই পাকিস্তান বা দ্বিজাতিতত্ব চিন্তা মাথায় আনেননি। চেয়েছেন একসাথে থেকে মুসলিমপ্রধান রাজ্যগুলোর স্বায়ত্বশাসন। কিন্তু কংগ্রেস সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে প্রাদেশিক চুক্তি মেনে নেয়নি। ১৯২৯সালে জিন্নাহর ১৪দফা যখন প্রত্যাখ্যাত হয়, অর্থাৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসন যখন কংগ্রেস প্রত্যাখান করে তখনি জিন্নাহ এক্সট্রিম পথ ধরেন, প্রদেশ বাদ দিয়ে তার মাথায় আসে আলাদা রাষ্ট্রের চিন্তা।এক্ষেত্রে ইংরেজদের সাহায্য কম ছিল না। ১৯০৬সালে মুসলিম লিগ গঠনের পরই তারা মুসলিমদের দাবি মেনে নিয়ে ১৯০৯ সালে মর্লি মিন্টো সংস্কার আইন চালু করে, যেখানে ছিল হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের ব্যবস্থা। তারা প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দেয়, শাসন প্রক্রিয়া ভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য ভিন্ন। তবে পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থা না করে উপায়ও ছিল না। কারণ মুসলমানরা ছিল পশ্চাদপদ। কাজেই তাদের সুযোগ করে দিতেই এই কোটা পদ্ধতি রাখা।এই প্রত্যাখ্যান, পালটা প্রত্যাখ্যানকে ক্ষমতার রাজনীতিও বলা যায়। প্রকৃতপক্ষে কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ, দুই দলের জন্মই হয়েছে একে অপরের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে। কাজেই তাদের দাবিদাওয়াতে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। আর কেন এই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া, তার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হবে কয়েকশ বছর আগে, যেভাবে ক্রমশ হিন্দু মুসলিমদের মাঝে একটা বিরাট বৈষম্য তৈরি হয়েছিল, যে বৈষম্য তাদের নিজ নিজ স্বার্থে পৃথক করে ফেলেছিল।ঘটনাচক্রে তাদের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিল উপমহাদেশ রাজনীতির ভাগ্য। উভয়পক্ষই চেয়েছে নিজেদের একচ্ছত্র শাসনক্ষমতা, আপসরফা বা মিলেমিশে দেশ শাসনের উদ্যোগ তাদের মধ্যে ছিল না।
৪. দেশভাগ, অনিবার্য নাকি নিবার্য, দায় কার:প্রশ্ন হল, দেশভাগ কি তাহলেই অনিবার্যই ছিল? এখন বলি, কিছু পদক্ষেপের কথা, যা গ্রহণ করলে হয়তো দেশভাগ ঠেকানো যেত।কংগ্রেসের সরকার গঠন প্রত্যাখ্যান -১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে বাঙালি প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগ করে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে। কংগ্রেস ৬০ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু তা সরকার গঠনে যথেষ্ট ছিল না। সারা বাংলায় একে ফজলুল হকের একক জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকায় তাকে বাংলার গভর্নর মন্ত্রিসভা গঠন করতে বলেন। তার দল কৃষক প্রজা পার্টির আসন ছিল ৩৮। ফজলুল হল চান কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন সরকার করতে। কিন্তু কংগ্রেস এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে। যদিও বঙ্গীয় কংগ্রেসের শরৎ বসু রাজি ছিলেন কিন্তু নেহেরুদের বিরোধিতায় তা সম্ভব হয়নি।দেখা যাচ্ছে কংগ্রেস শুধু মুসলিম লিগের বিরোধি ছিল না, বাংলায় হিন্দু মুসলিম (কংগ্রেস-লিগ) যৌথ সরকার গঠনেও তারা অনাগ্রহি ছিল।একই ঘটনা ঘটে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচনে। সেখানে মুসলিম লিগ ও কংগ্রেসের কোয়ালিশন সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেহেরু কর্তৃক নাকচ হয়ে যায়।সুতরাং ব্রিটিশ ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে এই প্রথম কংগ্রেস-মুসলিম লিগ সমঝোতা ও যৌথ সরকার হবার যে সুবর্ণ সুযোগ ছিল, তা বাস্তবে হলে আজকের দেশভাগ নাও হতে পারত। কারণ এই সমঝোতা থেকে পরবর্তিতে হয়তো তাদের মধ্যে মিত্রতা তৈরি হতে পারত।হিন্দু মহাসভার ঘোষণা-মুসলিম লীগের আগে হিন্দু মহাসভাই প্রথম তাদের এক অধিবেশনে প্রথম ঘোষণা দেয় যে, হিন্দু জনজাতি ভারতের আদি অধিবাসি ও তারা মুসলিম হতে আলাদা। যতীন সরকারের এক নিবন্ধমতে,হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকর ১৯৩৮-এর ডিসেম্বরে মহাসভার নাগপুর অধিবেশনে বলেন, ‘উই দি হিন্দুজ আর অ্যা নেশন বাই আওয়ারসেলভ্স’। অর্থাৎ নৃতাত্ত্বিক মিলের বিপরীতে ধর্মীয় তত্ত্ব হাজির করে তারা।জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বসবদিক থেকে পিছিয়ে থাকা মুসলিম জনগণকে একত্র করতে পেড়েছিলেন জিন্নাহ তার টু নেশান থিওরি দিয়ে। যখন তিনি দেখলেন, কংগ্রেস কিংবা হিন্দু মহাসভা অথবা ভারতবর্ষের জনমত- সবটাই তাঁর রাজনৈতিক সুবিধার বিপরীতে চলে যাচ্ছে, তখনই তিনি আনলেন এই তত্ত্ব, ঘোষিত হল ১৯৪০সালে।মন্ত্রীমিশন ও দাঙ্গা ১৯৪৬ সালে সংগঠিত দাঙ্গা দেশভাগকে অনিবার্যতা ও দ্রুততার দিকে নিয়ে যায়।ক্যাবিনেট মিশন সে বছর ভারতের ওপর শাসনপ্রক্রিয়া তুলে দেবার পরিকল্পনা করে। শুরুতে মুসলিমপ্রধান মুসলিম লীগ ও হিন্দুসমর্থক কংগ্রেসকে কিছু যৌথ প্রস্তাব দেয়া হয়। উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শাসনের সমণ্বয় ও সমবণ্টনের ভিত্তিতে ক্লিমেন্ট এটলি এই প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেন। একটি প্রস্তাব ছিল, যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতে থাকবে মুসলিম ও হিন্দুপ্রধান অঞ্চল নিয়ে আলাদা প্রদেশ এবং বাংলা ও আসামপ্রদেশ। কিন্তু কংগ্রেস এই সাম্প্রদায়িক প্রস্তাব আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করে। পরে ব্রিটিশ সরকার আশ্বাস দেয়, অন্তর্বর্তী সরকারে কংগ্রেস সংবিধান রচনায় স্বাধীনতা পাবে। এই স্বাধীনতা ব্যবহার করে কংগ্রেস নিজ ইচ্ছামত ও মুসলিম লীগের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নেবে- এমন আশঙ্কায় ভারতজুড়ে হরতালের ডাক দেয় মুসলিম লীগ। ফলে দেশব্যাপী ঘটে দাঙ্গা। প্রথমে কলকাতায়, পরবর্তীতে ভারতের অন্যান্য স্থানে।এখন প্রশ্ন আসে, দেশভাগে কার বেশি দায় ছিল, কংগ্রেস নাকি মুসলিম লিগের?দুই পক্ষের অনমনীয় অবস্থানই আসলে দায়ী। নেহেরু বলেছিলেন, ভারতবর্ষ একজাতির দেশ কিন্তু বুঝিয়েছেন হিন্দু জাতিকেই। তার প্রতিক্রিয়াতেই জিন্না বলেছেন ভারতে আসলে দুই জাতি, হিন্দু এবং মুসলিম। কাজেই দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল একটি প্রতিক্রিয়া। তাই জিন্নাহও তার দাবিতে ছিলেন অটল।তারপরেও দ্বিজাতি বাদে একত্র থাকবার সুযোগ থেকে গিয়েছিল, ১৯৪৭ সালে।ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য ব্রিটিশরা সেবছর অন্তর্বর্তী সরকার তৈরি করে, যাতে স্বরাষ্ট্র দপ্তর নেন কংগ্রেসের সরদার প্যাটেল কিন্তু তিনি তার দলের ইচ্ছেমত কোন কাজই বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না। এর কারণ অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা লিয়াকত আলী খান। লিয়াকতের অনুমোদন ছাড়া কোন কাজ করা যাচ্ছিল না। সুতরাং এই অন্তর্বর্তী যৌথ সরকারেই পরিষ্কার হয়ে গেল, কংগ্রেস আর মুসলিম লিগ প্রকৃত অর্থে যৌথভাবে কাজ করতে পারবে না।নেহেরু, সরদার প্যাটেল, মাওলানা আজাদ, গান্ধী- এই চারজন ছিলেন কংগ্রেসের প্রধান নেতা।ব্রিটিশদের ক্ষমতা ছাড়ার কিছুদিন আগে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে গান্ধী প্রস্তাব করেছিলেন, জিন্নাহকে অখন্ড ভারতবর্ষের প্রধান করা হোক, তাহলে হয়তো ভারতভাগ ঠেকানো যাবে। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড় দিতে হয়। ভারতবর্ষ অখন্ড রাখার স্বার্থে নেহেরু, প্যাটেলদের ছাড় দিতে হত।কিন্তু কিছুদিন আগের অন্তর্বর্তী সরকারের অভিজ্ঞতায় তারা সেটা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। তাদের মনোভাব হয়তো এমন ছিল, জিন্নাহ কোন ছাড় দিচ্ছেন না, আমরা কেন ছাড় দেব?সুতরাং গান্ধী বলতে বাধ্য হন, ভারতভাগ অনিবার্য। আর মৌলানা আজাদ অত্যন্ত হতাশ হলেন তাদের ক্ষমতালোভের প্রতি। তার ভাষায়, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ হয়তো ভারত ভাগ করার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন, কিন্তু প্যাটেল সে পতাকা বহন করছেন। কোন পক্ষেরই ছাড় না দেয়ার মানসিকতা থেকে প্রমাণ হল, অখন্ড ভারত নয়, নেহেরু জিন্নাহদের কাছে ক্ষমতাই আসল উদ্দেশ্য।এদিকে দেশভাগের পর দুইবাংলা এক থাকার সম্ভাবনা থেকে গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে।কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকার প্রশ্নে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু কংগ্রেসি নেতারা সবাই একবাক্যে হিন্দুপ্রধান ভারতের সাথে থাকতেই সায় দেন। একই পথে হাঁটে আসামও। যার কারণে সোহরাওয়ার্দী ও শরৎবসুর উদ্যোগে ১৯৪৭সালে যুক্তবাংলার এক প্রস্তাব শুরুতেই ভেস্তে যায়। ১৯৩৭সাল থেকে বাঙলায় হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষমতায় না আসা এর যেমন একটি কারণ, তেমনি পশ্চিমবঙ্গ ভারতের সাথে যুক্ত হলে একটি হিন্দু রাজনৈতিক নেতাদের দিয়ে পরিচালিত প্রাদেশিক সরকার গঠনের সহজ ও সুবর্ণ সম্ভাবনা- এ দুকারণে দুই বাংলা চিরকালের মত রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ ১৯৪১সালে। তার কিছুদিন পরেই হয় ভারতভাগ।তবে এর পটভূমি যেহেতু অনেক আগেই আস্তে আস্তে তৈরি হচ্ছিল, তাই রবীন্দ্রনাথের অনেক অভিভাষণ কিংবা লেখাতেও এর কার্যকারণ এসে যায়। তিনি সবার আগে ছিলেন একজন কবি। তবে একজন রুচিমনস্ক ও সূক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন মানুষ হবার সুবাদে সমাজ ও সমাজের মিলন নিয়েও তিনি শুরুতে ছিলেন সচেতন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরিপ্রেক্ষিতে ৩০টির বেশি মিলনাত্মক ও দেশাত্মক গানরচনা, রাখিবন্ধন অনুষ্ঠান ছাড়াও তিনি লেখায় তুলে ধরেন তার মনোভাব। ১৯০৭ সালে ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘ব্যধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে তিনি লেখেনঃ”হিন্দু-মুসলমানের সম্বন্ধ লইয়া আমাদের দেশে একটা পাপ আছে; এ পাপ অনেক দিন হইতে চলিয়া আসিতেছে। ইহার যা ফল তাহা ভোগ না করিয়া আমাদের কোনো মতেই নিষ্কৃতি নাই। ...... আর মিথ্যা কথা বলিবার প্রয়াজন নাই। এবার আমাদিগকে স্বীকার করিতেই হইবে হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে একটা বিরোধ আছে। আমরা যে কেবল স্বতন্ত্র তাহা নয়। আমরা বিরুদ্ধ।আমরা বহুশত বত্সর পাশে পাশে থাকিয়া এক খেতের ফল, এক নদীর জল, এক সূর্যের আলোক ভোগ করিয়া আসিয়াছি; আমরা একভাষায় কথা কই, আমরা একই সুখ দুঃখে মানুষ; তবু প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রতিবেশীর যে সম্বন্ধ মনুষ্যোচিত, যাহা ধর্মবিহিত, তাহা আমাদের মধ্যে হয় নাই। আমাদের মধ্যে সুদীর্ঘকাল ধরিয়া এমন একটি পাপ আমরা পোষণ করিয়াছি যে, একত্রে মিলিয়াও আমরা বিচ্ছেদকে ঠেকাইতে পারি নাই। এ পাপকে ঈশ্বর কোনোমতেই ক্ষমা করিতে পারেন না”হিন্দু মুসলমানে সদ্ভাব না হবার পরিণতিকে ইংরেজদের ঘাড়ে নন, নিজেদের ওপরেই দায় চাপাতে সোচ্চার ছিলেন তিনি।মওলানা আবুল কালাম আজাদ”ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ নামক আত্মজীবনীমূলক বই ১৯৬১ সালে প্রকাশ করেন কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আবুল কালাম আজাদ। যিনি ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের প্রধান নেহেরুর অতি ঘনিষ্ঠ। নেহেরু, আজাদ, প্যাটেল- তিনজনই ছিলেন কংগ্রেসের প্রধান নেতা।এই বইতে তিনি লেখেন, শুরুতে দেশভাগে অনমনীয় নেহেরুকে ছাড় দিতে রাজি করান এক বিদেশিনী, তিনি লর্ড মাউন্টব্যাটেনের স্ত্রী লেডি মাউন্টব্যাটেনের কথায় মত বদল করেন। সে সময়ে এডউইনা মাউণ্টব্যাটেন ও নেহেরু ঘনিষ্ঠ চলাফেরা ও সম্পর্কই এর মূল প্রভাবক বলে দায়ী করেছেন মওলানা আজাদ।প্যাটেল, নেহেরু, আজাদ- ভারত ঐক্যবদ্ধ রাখার পেছনে শুরুতে এই তিন কংগ্রেসি নেতা ছিলেন গান্ধীর মতই অটল। এই তিনজনের সম্মতি ব্যতীত কংগ্রেসের পক্ষে ভারতভাগ সম্ভব হত না। ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, যৌথ সরকার পরিচালনায় তিক্ত অভিজ্ঞতা- একে একে নেহেরু আর প্যাটেল দুজনকেই ভারতভাগে উদ্বুদ্ধ করে। কিংবা বলা যায়, জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের দিকে ধাবিত হয় পুরো ভারতবর্ষ।স্বল্পকালিন রাষ্ট্র পরিচালনায় কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের মধ্যে যে অসহযোগিতা আর অনমনীয় মনোভাব ছিল, তার ভিত্তি ছিল পারস্পরিক আস্থাহীনতা। দেশভাগ হয়তো আপস করে এড়ানো যেত কিন্তু তাদের মধ্যকার এই আস্থাহীনতা ছিল অনিবার্য, দীর্ঘ ইতিহাসের অনেক ঘটনার পরম্পরা।
তথ্য :
• আন্তর্জাল, বিভিন্ন পত্র – পত্রিকা ।
• সহায়ক খবরঃনেহেরু যে কারণে ভারত ভাগ করতে রাজী হলেন, বিবিসি বাংলা, ৩০-০৮-১৭দেশভাগ অনিবার্য ছিল না, আহমদ রফিকের সাক্ষাৎকার। প্রথম আলো। ৩০-০১-১৫।
• দ্বিজাতিতত্ত্ব-উদ্ভবের কার্যকারণ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ, যতীন সরকার। ইত্তেফাক। ৩১-০১-২০
• অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, আকবর আলী খান। প্রথমা।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।