সামাজিক মাধ্যমের দেখনদারী

এই কথাটা মানতে হবে যে, নীরবই হোক বা সরব, সাম্প্রতিককালে সমাজমাধ্যমের প্রসার বৈপ্লবিক বললে একটুও অত্যুক্তি হবে না। এর প্রভাব শুধুই এ দেশ নয়,বিশ্বব্যাপী। ডেটারিপোর্টাল সংস্থার সর্বশেষ গ্লোবাল ওভারভিউ রিপোর্ট (২০২২) থেকে জানা যাচ্ছে যে, সারা পৃথিবীতে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৬০ কোটি, যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ৮০০ কোটি। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় ৫৮% মানুষ এখন নিয়মিত সমাজমাধ্যম ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, এই ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিপুল হারে বাড়ছে। যেমন, গত এক দশকেই তা তিনগুণ বেড়েছে। সমাজমাধ্যমের প্রধান যে-মঞ্চগুলো, তা ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনুযায়ী সাজালে এরকম দাঁড়াচ্ছে : ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, এবং মেসেঞ্জার। এ ছাড়াও জনপ্রিয় মঞ্চগুলোর তালিকায় আছে পিন্টারেস্ট, টুইটার এবং লিঙ্কড-ইন। ভারতের ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৬.৭ কোটি, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এক নজরে কম মনে হলেও, ভারতে জনসংখ্যার একটা বড় অংশের মধ্যে দারিদ্র ও নিরক্ষরতার কথা ভাবলে বা এই মাধ্যমের জন্যে যে যে পরিকাঠামো আবশ্যক তার গ্রামাঞ্চলে সীমিত বিস্তারের পরিপ্রেক্ষিতে দেখলে, এই সংখ্যাটা মোটেই অগ্রাহ্য করার মতো নয়। শুধু তাই নয়, ব্যবহারকারীর সংখ্যার সাম্প্রতিক বৃদ্ধির হার দেখলে গত এক বছরেই ভারতে যা বৃদ্ধির হার তা সারা পৃথিবীতে বৃদ্ধির হারের চারগুণের বেশি। উপরোক্ত রিপোর্ট থেকে এও জানা যাচ্ছে যে, সারা বিশ্বে গড়ে সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা এই মঞ্চগুলোতে দিনে আড়াই ঘণ্টা মতো কাটাচ্ছেন, যা বছরে প্রায় পাঁচ সপ্তাহের সমান। আর যে-কোনও গড় হিসেবের মতো, এই সংখ্যাটির পেছনেও একটা বিভিন্নতার ছবি লুকিয়ে আছে— কেউ-কেউ সারাদিনের অনেকটা সময় এখানে ব্যয় করছেন। হয়তো করোনাকালের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা সমাজমাধ্যমের ব্যবহার বেশি করে বাড়িয়েছে। প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারার মতো এর কিছু ভাল দিক নিশ্চয়ই যেমন আছে, আবার এই পরিসরের সমস্যাগুলো নিয়েও আমরা আগের থেকে বেশি সচেতন হচ্ছি। ঠিকই, সমাজমাধ্যমেই যখন এই সমালোচনা চোখে পড়ে তখন সেটা একটু পানশালায় মদ্যপানের কুফল নিয়ে বক্তব্য রাখার মতো মনে হয়। তাহলেও, এর ব্যাপক প্রসার এবং তার আমাদের জীবনের নানা পরিসরে প্রভাব নিয়ে একটু তলিয়ে না ভেবে ‘সমাজমাধ্যম ভাল না মন্দ’ শুধু এরকম একটা বিতর্কের মধ্যে আটকে থাকলে, সমাজ, প্রযুক্তি, অর্থনীতি আর রাজনীতির যে জটিল মিশেল সমাজমাধ্যমের উত্থান, প্রসার এবং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অন্দরমহলে ঢুকে পড়ার প্রক্রিয়ার পেছনে কাজ করছে, তার চরিত্র ঠিক করে বোঝা যাবে না আর তার অবাঞ্ছিত প্রভাবগুলো নিয়ন্ত্রণও করা যাবে না। 
ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর সমষ্টির মধ্যে যে-আদানপ্রদানের প্রথাগত রাস্তাগুলো, সমাজমাধ্যম এক অর্থে সেগুলোর ওপর দিয়ে নতুন এক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মিলনমঞ্চ স্থাপন করেছে। এই আপাত-গণতান্ত্রিক ও অবাধ প্রবেশাধিকারের দিকের ভাল ও মন্দ দুই দিকই আছে।  
সমাজমাধ্যমের সে-অর্থে কোনও প্রামাণ্য সংজ্ঞা নেই, কিন্তু এর কতগুলো মূল বৈশিষ্ট্য আছে, যার থেকে একটা কাজ চালানোর মতো বর্ণনা দেওয়া যায়। স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট— এই নানা ধরনের যন্ত্র ব্যবহার করে এবং আন্তর্জাল ভিত্তি করে এই মাধ্যমে যে-বিষয়বস্তু, তা ব্যবহারকারীরা (যা ব্যক্তি বা কোন গোষ্ঠী হতে পারে) নিজেরাই তৈরি করেন বা অন্যদের তৈরি করা বিষয়বস্তু অন্যদের সাথে ভাগ করে তার প্রচার ঘটান, এবং সেই নিয়ে আলোচনা চলে। এই যে ব্যবহারকারীদের সৃষ্টি করা বিষয়বস্তু, সেটাই সমাজমাধ্যমের বহমান উপাদান। আর, সমাজমাধ্যমের যে-কাঠামো, তা হল জালিকা বিন্যাস (নেটওয়ার্ক) ভিত্তিক— আপনি নিজের (বা ছদ্ম) পরিচিতির রেখাচিত্র তৈরি করে এখানে যোগ দিতে পারেন, এবং অন্য ব্যবহারকারী ও তাদের সামাজিক বৃত্তে প্রবেশ করতে পারেন। কার সাথে কতটা মিশবেন বা আপনার দ্বারা পরিবেশিত বিষয়বস্তু কার কতটা নাগালের মধ্যে রাখবেন, তার ওপর আপনার খানিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও, প্রযুক্তির কারণে আপনার দ্বারা পরিবেশিত যে-কোনও বিষয়বস্তুই যে অন্য নানা বৃত্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে (বা ক্ষেত্রবিশেষে ভাইরাল হয়ে যেতে পারে) সে-সম্ভাবনা থেকেই যায়। অর্থাৎ, ব্যক্তি, গোষ্ঠী আর সমষ্টির মধ্যে যে-আদানপ্রদানের প্রথাগত রাস্তাগুলো, সমাজমাধ্যম এক অর্থে সেগুলোর ওপর দিয়ে নতুন এক যোগাযোগব্যবস্থা এবং মিলনমঞ্চ স্থাপন করেছে। এই আপাত-গণতান্ত্রিক ও অবাধ প্রবেশাধিকারের দিকের ভাল ও মন্দ দুই দিকই আছে।  
ব্যক্তিগত ব্যবহারকারীর দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে দেখলে এর একটা দিক হল ভোক্তা হিসেবে আমাদের চয়নের যে-পরিসর তা অনেকটা বেড়ে যাওয়া। আমরা কী পড়ব, কী শুনব, কোন আড্ডা বা কী আলোচনায় অংশগ্রহণ করব, তার ওপর আমাদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যাওয়া। আমরা সমাজমাধ্যমে যা দেখি, তা আমাদের পছন্দের ওপর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে নির্ভর করে— এক তো আমাদের যা ইচ্ছে সেইরকম বিষয়বস্তু আমরা দেখি, শুনি, বা পড়ি; আবার আমরা যা দেখি, শুনি বা পড়ি, তার থেকে আমাদের পছন্দ আন্দাজ করে এইসব সমাজমাধ্যমের পেছনে যে কম্পিউটার অ্যালগোরিদম কাজ করে তাদের যেভাবে প্রোগ্রাম করা হয়, তার প্রভাবে সেইরকম পোস্ট আমরা বেশি করে পেতে থাকি। 
ব্যাবেলের মিনারের মতো কোলাহলে, কোনও নির্বাচন বা গুণমান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া না থাকলে মুড়ি আর মিছরি আলাদা করা মুশকিল হতে পারে। সেইরকম সমাজমাধ্যমে যে-রাজনৈতিক মতামত বা খবর প্রচারিত হয় (যার থেকে ‘হোয়াটস্যাপ জ্যাঠা’ বা ‘হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়’ কথাগুলো এসেছে) তার মধ্যে সত্যতা কতটা আর কতটা সম্পূর্ণ পক্ষপামতাদর্শগততে দুষ্ট প্রোপাগান্ডা, তা অনভিজ্ঞ প্রাপকের কাছে পরিষ্কার না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। 
এর সম্পূর্ণ উল্টো একটা উদাহরণ ভাবা যাক— ধরুন আমাদের সমস্ত খবর বা বিনোদন বা সাংস্কৃতিক চাহিদা তৃপ্ত হবার একটিই মাত্র উৎস হল কোনও একচেটিয়া সংস্থা; যেমন, আমাদের দেশে টিভি চালু হবার পর সরকারি সংস্থা ‘দূরদর্শন’ ছিল। সেখানে চয়নের স্বাধীনতা বা বক্তব্যের নিরপেক্ষতা বা ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের নিশ্চয়তা (দূরদর্শনে এক সময়ে অনেক ভাল অনুষ্ঠানের কথা মাথায় রেখেই বলছি) কোনওটাই আশা করা যায় না। আবার উল্টোদিকটাও দেখতে হবে। অবাধ প্রবেশাধিকার এবং যে যা খুশি বলছে, লিখছে এবং তার প্রচার হচ্ছে, তার খারাপ দিকও আছে। এই প্রসঙ্গে সুকুমার রায়ের পাগলা দাশু সিরিজের ‘আশ্চর্য কবিতা’ গল্পে স্কুল ইন্সপেক্টরের সামনে সব ছাত্রের চেঁচিয়ে কবিতা পড়া শোনার অত্যাচারের কথা মনে পড়ে যেতে পারে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে যে, উৎকর্ষ চিরকালই শিক্ষিত সংখ্যালঘু একটা গোষ্ঠীর চর্চার বিষয়। সংস্কৃতি হোক বা জ্ঞানচর্চা, সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হোক বা বিতর্ক, যে-কোনও ক্ষেত্রেই এলিটদের আর আমজনতার চর্চার মধ্যে একটা বড় ফারাক চিরকালই ছিল। প্রশ্ন হল, সমাজমাধ্যম কি এই ফারাক বাড়িয়ে দিচ্ছে? ব্যাবেলের মিনারের মতো কোলাহলে, কোনও নির্বাচন বা গুণমান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া না থাকলে মুড়ি আর মিছরি আলাদা করা মুশকিল হতে পারে। সেইরকম সমাজমাধ্যমে যে-রাজনৈতিক মতামত বা খবর প্রচারিত হয় (যার থেকে ‘হোয়াটস্যাপ জ্যাঠা’ বা ‘হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়’ কথাগুলো এসেছে) তার মধ্যে সত্যতা কতটা আর কতটা সম্পূর্ণ মতাদর্শগত পক্ষপাতে দুষ্ট প্রোপাগান্ডা, তা অনভিজ্ঞ প্রাপকের কাছে পরিষ্কার না হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। আর নামের মধ্যে ‘সমাজ’ থাকলেও কার্যত কি এ এক নতুন নেশা, যা আমাদের আরও অসামাজিক করে তুলছে? সকল লোকের মাঝে বসে, নিজের মুদ্রাদোষে আমরা আরও একা হয়ে যাচ্ছি কি? আসক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতাবোধ, মানসিক অবসাদ হওয়া স্বাভাবিক, এবং অবাধ সামাজিক আদানপ্রদানের যে অবাঞ্ছিত ও অন্ধকার দিকগুলো (যেমন, ঈর্ষা, মনোমালিন্য, মানসিক হেনস্থা), সেগুলো সারাক্ষণ বৈদ্যুতিন জানলা দিয়ে আমাদের নিজস্ব জগতে টেনে আনলে নানা মানসিক সমস্যা গুরুতর আকার নিতে পারে। শুধু তাই নয়, প্রযুক্তি অনেক সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দেয় ঠিকই, কিন্তু তার সার্বিক সামাজিক প্রভাব শুধু তার প্রযুক্তিগত দিকের ওপর নির্ভর করে না। তার প্রয়োগ নির্ভর করবে ক্ষমতাসীন শক্তির কেন্দ্রগুলো— তা বাণিজ্যিকই হোক বা রাজনৈতিক— সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করবে। এই প্রযুক্তি ও তার ব্যবহার আপাতভাবে বিনামূল্যে আয়ত্ত হলেও, বড় বাণিজ্যিক সংস্থাগুলো সমাজমাধ্যমে মানুষের আচরণ এবং পরস্পরের সাথে আদানপ্রদান খুব মনযোগ দিয়ে নিরীক্ষণ করে যাচ্ছে, অ্যাকোয়ারিয়ামে মাছ দেখার মতো করে, এবং তা থেকে প্রাপ্ত তথ্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছে— যার একমাত্র উদ্দেশ্য মুনাফা, সমাজকল্যাণ নয়। আপনি সম্প্রতি গুগলে কী খুঁজেছেন, ফেসবুকের পাতায় কী লিখেছেন, এবং ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কী কিনছেন, এইসব বিশ্লেষণ করেই শুধু আপনার নয়, সমাজমাধ্যমে আপনি যাদের সাথে বেশি মেশেন তাদের ফেসবুক পাতাতেও সেই অনুযায়ী বিজ্ঞাপন আসতে থাকবে।  
রাষ্ট্রও কীভাবে এর মাধ্যমে নাগরিকদের উপর নজরদারি করার চমৎকার ও সুলভ উপায় পেয়ে গিয়েছে, সেগুলো ভুললে চলবে না। আবার, গুজব বা ভুল খবর খুব ঠান্ডা মাথায় এবং সংগঠিতভাবে ব্যবহার করে রাজনীতির পরিসরে যে-হিংসাত্মক ঘটনাগুলো ঘটছে, তা যে গণতন্ত্রের পক্ষে আশঙ্কাজনক, তা নিয়েও আজ দ্বিমত নেই। 
তাই সামাজিক মাধ্যমে দেখনদারীতে বিশ্বাসী না হয়ে প্রকৃত সত্য উদঘাটনে ব্রতী হওয়া উচিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।