ভালোবাসা বাকি আছে

সেদিন সকালে থেকেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল, সকলের মত রাকারও  ভীষণ আলসেমি লাগছিলো। সারাটা দিন ঘরে বসে থেকে রাকার খুব একঘেয়ে লাগছিলো, তাই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় মেঘলা শহরের রাস্তায় ও বেরিয়ে পড়লো মন ভালো করতে। কিছুক্ষণ পরে এই ঠান্ডা আবহাওয়ায় ওর ইচ্ছে হলো এক কাপ গরম কফির উষ্ণতার স্বাদ পেতে। তাই মনে মনে "এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকেনা তো মন....." গাইতে গাইতে বেরিয়ে পড়লো রাকা।

শহরের রাস্তার উপর ছোট্ট একটি ক্যাফেতে রাকা বসে ছিল। তার হাতে এক কাপ গরম কফি, দুচোখে অল্প বৃষ্টি দেখে মনে মনে হারিয়ে যাচ্ছিল। রাকার জীবন ছিল শান্ত, তবে একাকীত্বে ভরা। অনেক দিন আগে এক হৃদয় ভাঙা ঘটনায়, সে ভালোবাসার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওর প্রেমকে হারিয়েই ফেলেছিল। আজ কেন জানিনা এই বর্ষণ স্নাত দিনে নিজের নিঃসঙ্গতাটা ওর মনকে বারবার জানান দিচ্ছে। এসব ভাবতে ও হারিয়ে গেছিলো তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে স্মৃতির জগতে।

অন্যদিকে ছেলেটিরও এই বৃষ্টিভেজা দিনে আর কিছু ভালো লাগছিলো না, মনটাও কিরকম অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছিলো। কিরকম একটা অনুভূতি যেন ওর ভিতরে খেলা করছিলো - মনে হচ্ছিলো "আজি  ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে জানি নে,   জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না....."

ক্যাফের দরজা খোলার শব্দে রাকা হঠাৎই জেগে উঠল। দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল একটি মানুষ , যাকে ওর খুব চেনা লাগছিলো। ভালো করে লোকটিকে  দেখলো আর চেনার চেষ্টা করলো। চেহারাটা কিছুটা বদলেছে এই কিছুদিনে- একটু রোগা হয়েছে আর অবিন্যস্ত, অবশ্য এটা নূতন নয়। তবে কোথায় যেন নিজের প্রতি অবহেলার ছাপ রয়েছে।

হ্যাঁ, ও রাকার এক সময়ের প্রিয় মানুষ ইন্দ্রজিৎ, সংক্ষেপে ইন্দ্র । দু'জনের চোখে চোখ পড়তেই মুহূর্তের জন্য সময় থেমে গেল। রাকা অবাক হয়ে দেখল, ইন্দ্রর চোখে সেই পুরনো উজ্জ্বলতা এখনো রয়ে গেছে। কিছু না বলেই, ইন্দ্র ধীরে ধীরে রাকার দিকে এগিয়ে এল।“রাকা ,” রাহুল মৃদু কণ্ঠে বলল, “তোমাকে এখানে দেখে আমি খুব অবাক হয়েছি।”

রাকা সামান্য হাসল, “আমি তো এখানে প্রায়ই আসি। তুমি কেমন আছো?”ইন্দ্র বসে গিয়ে বলল, “ভালো, তবে অনেক কিছুই বদলে গেছে। তুমি?”রাকা হাসি ধরে রেখে বলল, “বদলে গেছে অনেক কিছু। কিন্তু কিছু জিনিস যেমন ছিল তেমনি রয়ে গেছে।”দু’জনের মাঝে নীরবতা নেমে এলো, তবে সেই নীরবতায় এক ধরনের শান্তি ছিল। ইন্দ্র কফির অর্ডার দিল, আর রাকা তার পুরনো স্মৃতিগুলো মনে করে মুচকি হাসল।কিছুক্ষণ পর ইন্দ্র বলল, “রাকা , আমাদের গেছে যে দিন  একেবারেই কি গেছে, কিছুই কি নেই বাকি।" নিঃসঙ্গ রাকার চোখে অশ্রু এসে গেল, কিন্তু সে তা লুকিয়ে রেখে একটু চুপ করে থেকে বলল, “ রাতের সব তারাই আছে  দিনের আলোর গভীরে।"

এইকথা শোনার পরে ইন্দ্র রাকাকে কাঁপা গলায় বললো, " রাকা, আমি অনেক ভেবেছি। আমাদের অতীত ভুলে যেতে পারিনি। আমরা কি আবার নতুন করে শুরু করতে পারি?”

রাকা জবাব দিলো, " আমিও ভেবেছি, ইন্দ্র। হয়তো আমরা আবার চেষ্টা করতে পারি।”ইন্দ্রর মুখে হাসি ফুটল। তবুও আবার প্রশ্ন করলো, “তাহলে, আমরা কি নতুন করে শুরু করব?” রাকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে হেসে ওঠে। নিঃশব্দ কিন্তু প্রাণ খোলা হাসি।    ইন্দ্র রাকার কাঁধে হাত রাখে। রাকা ইন্দ্রর দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেলে। দুই ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে রাকার কোলে। রাকা , তার ভিতরে গভীর এক প্রশান্তি অনুভব করে, সে বুঝতে পারে তার কাঁধে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত হাত ভালোবাসার হাত। ইন্দ্রর চোখও ঝাপসা হয়ে ওঠে। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছিল, কিন্তু বাইরের এই অঝোর বৃষ্টির চেয়ে ইন্দ্রর কাছে রাকার চোখের জলের আবেদন অনেক বেশি। ইন্দ্রর মনে হলো যেন, এই দুই ফোঁটা জলের সিক্ত করার ক্ষমতা আকাশের জলের চেয়ে অনেক অনেক বেশি।

পুরনো স্মৃতির কফি গন্ধে, বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায়, তাদের হারানো ভালোবাসা আবার জেগে উঠল। তাদের গল্প আবার নতুন করে শুরু হলো। নতুন করে জীবনের পথচলা শুরু হলো দু’জনের, কারণ ভালোবাসা বাকি আছে যে ওদের।


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।