ছদ্মবেশ

দর্শকদের হাততালি আর উৎসাহ বার্তায় হলটা ভরে উঠলো, এই অনুপ্রেরণার শব্দে শিল্পী তখন এক অজানা উত্তেজনায় কেঁপে উঠছে। ওর মনে হচ্ছে ওর দমবন্ধ হয়ে যাবে, চোখ বেয়ে নামছে অশ্রুধারা - সেটা কিসের? - আনন্দের না দুঃখের!

'সাব্বাস লাবণ্য। যেমন অভিনয় আর তেমন হয়েছে তোর মেকআপ টা! ঠিক মনে হচ্ছে কেউ সত্যি সত্যি অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরেছে। এমন মেকআপ করা মুখের কথা নয়।" স্টেজের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন জীবন মল্লিক। থিয়েটারের দুনিয়ায় হেভিওয়েট মানুষ একজন, বিশাল তার নাম। তাঁর মতো পরিচালকের থেকে এহেন প্রসংশা ভালোই লাগে। হোকনা, সে পাঁচ মিনিটের রোল।

লাবণ্য প্রায় বছর তিনেক ধরে জীবন মল্লিকের দলের সাথে যুক্ত।তবে কাজটা পাওয়া অতটাও সহজ ছিল না। জীবন মল্লিকের শ্বশুরবাড়ি লাবণ্যদের পাড়ায়। সেবার লাবণ্যদের পাড়ার পুজোর সুবর্ণ জয়ন্তী। তাই নিয়ে হৈ চৈ। এলাহী আয়োজন। বাইরে থেকে শিল্পী এনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। তার সাথে ছিল পাড়ার কচিকাচাদের নাটক, বড়দের নৃত্যনাট্য। পুজো কমিটি লাবণ্যকে মেকআপের ভার দেয়। পাড়ার নাটকে লাবণ্যর মেকআপ চোখে পড়ে জীবন মল্লিকের। জহুরী জহর চেনে.. সেখান থেকেই যোগাযোগ.. এখন তো জীবন মল্লিকের দলের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ লাবণ্য! রোজ মঞ্চে সবাইকে তার মেকআপ এর জাদুতে সাজিয়ে তোলে সে। আজ নিজেই। মঞ্চে ছোট্ট রোলে অভিনয়ের সুযোগ টাও খানিকটা অপ্রত্যাশিত,পাওয়া অতটাও সহজ ছিল না। এই রোলটা রানী করতো, কিন্তু সে বেকায়দায় হোঁচট খেয়ে পা ফুলে বাড়িতে শয্যাশায়ী। তাই লাবণ্য খানিকটা যেচেই এই রোলটার জন্য ইচ্ছে প্রকাশ করে। জীবন মল্লিকও আর আপত্তি করেননি। ছোট একটা রোল! তিন চারটে ডায়ালগ! সবারই তো মনে সাধ থাকে মঞ্চে ওঠার!

মঞ্চের কাজ শেষ করে, সহশিল্পীদের বাহবা কুড়িয়ে মেকআপ রুমে ঢোকে লাবণ্য। অন্যদিন এ রুমটায় অনেক সময় একা থাকে সে। বাকিরা হয় মঞ্চে বা অন্য কোথাও ব্যস্ত। শোয়ের আগে আর পরে যত ব্যস্ততা এখানে। নাটক তখনও চলছে, লাবণ্য ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়.. আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়..

আয়নায় যাকে দেখছে সেই তো আসল লাবণ্য। নিজের মুখের ওপর দুহাত রাখে সে! কী খড়খড়ে, এবড়ো খেবড়ো চামড়া! দু চোখ বুঁজে আয়নার সামনে রাখা চেয়ারটায় ধপ করে বসে পড়ে সে।

চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রায় দশ বছর আগেকার রক্তাক্ত পুরোনো স্মৃতি। সবে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে ঢুকেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সুশ্রী প্রাণোচ্ছল একটা মেয়ে। ঝর্ণার মতো ঝরঝরে কথাবার্তা আর ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি। খুব সহজেই চোখে পড়লো কলেজের বখাটে ছেলে মানিকের । মানিক বড়লোক ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র ছেলে। পয়সা আর ক্ষমতার জোরে কলেজ বেশ নামডাক। কিন্তু লাবণ্যর সেখানে মন বসে না। বহুবার চেষ্টা করেও, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মানিক যেদিন মুখে অ্যাসিড মারে, বুকের সেই ব্যথাটা আজ স্টেজে আর একবার উপলব্ধি করে সে। নিজের জীবনের কথা বলতে যে ওই পাঁচ মিনিটই যথেষ্ট...

কোনোরকমে চোখটা বেঁচেছিল সেদিন। তারপরের মাস দুয়েক হাসপাতালে কেটেছিল অসহ্য যন্ত্রণায়। এরপর একাধিক অস্ত্রোপচারের ফলে মুখের চেহারা হয়ে ওঠে ভয়ানক।মা বাবা ছাড়া সকলেই প্রায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। শুরু হয় লাবণ্যর বাঁচার লড়াই। কে দেবে ওকে কাজ? যেখানেই কোনো কাজের জন্য যায়, সেখানেই ওর ঐ ভয়ানক রূপে আঁতকে ওঠে সকলে। হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে সে। প্লাস্টিক সার্জারি করে রূপ বদলাবে এমন সামর্থ্য তার নেই। তাহলে কি উপায়?

সেই উপায়ের হদিস করতে গিয়েই এই মেক আপ জগতে আসা...

'লাবণ্য তোর হলো? মেকআপ তুলে চল তাড়াতাড়ি! বাড়ি ফিরতে হবে তো!"

বাইরে থেকে কড়া নাড়ার আওয়াজে সম্বিত ফেরে তার।চটপট মেকআপ বক্স খুলে তৈরি হয়ে নেয় সে। এভাবেই রোজ নিজের হাতের গুণে মুখের ক্ষত ঢাকে লাবণ্য। এগিয়ে চলে মানবজীবনের অনিশ্চয়তার পথ ধরে,এগিয়ে চলে জীবন যুদ্ধে....

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।