স্বাধীনতা

আমি মেঘের মতো -মাটি ছুঁতে চাইলে আমাকে বৃষ্টি হয়ে ঝরতে হয়। তখন আমি আর মেঘ থাকি না , হয়ে যাই মেঘের কান্না।

সাব-ইন্সপেক্টর দীপক গুহ খুব শক্ত নার্ভের মানুষ । সহজে ঘাবড়ে যাওয়া তার স্বভাব বিরুদ্ধ । জীবনের প্রায় অর্ধেকটা সময় এই পেশায় কাটিয়ে দিলেন ,খুন-খারাবি থেকে শুরু করে কতো যে ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী তিনি তার হিসাব নেই । প্রথম-প্রথম এত হিংস্রতা আর প্রাণঘাতী ব্যাপার স্যাপার দেখলে একটু কেমন লাগলেও এখন আর কোন কিছুতেই আর কিছু হয়না তার । মনটা যে কখন পাথরের মত শক্ত হয়ে গেছে কালে কালে নিজেও বুঝতে পারেন নি। তবে মাঝে মাঝে মনে হয় মনটা পুরো মরে যায় নি, পাথরের তলা দিয়ে ধীরে ধীরে ফল্গু নদীর মত প্রবহমান। 

ইদানীং কালে একটা বাচ্চা মেয়ের মৃত্যু দেখে ওনার যেন একটা বড় ঝটকা লাগলো। স্বভাব শান্ত মানুষটাকে কিন্তু এই বাচ্চা মেয়েটার মৃত্যু কেমন নাড়িয়ে দিয়েছে । মেয়েটার লাশের দিকে তাকালেই তার ছোটো মেয়েটার মুখ কেমন চোখে ভেসে ঊঠছে ।অশান্ত চঞ্চল মনটাকে তিনি কিছুতেই স্থির করতে পারছেন না । তিনি ভাবতে লাগলেন যে আজকালকার ছেলেমেয়েগুলো বোঝে না ওদের এই ধরণের হঠকারী 
কাজের ফলে মা - বাবার মনের উপর দিয়ে কি যায়!
কি এমন দুঃখ হল মেয়েটার যে জীবনটা শুরু হবার আগেই শেষ করে দিতে হল ?

আজকালকার ছেলেমেয়েদের কোনকিছুর ঠিক নেই ,সবকিছুতে বাড়াবাড়ি ।জীবনে এতো ঝুঁকি নিয়েছেন ,কতো লাশ নাড়াচাড়া করেছেন কিন্তু এতোটা নিঃস্ব কখনো মনে হয়নি নিজেকে ।
কনস্টেবল বাচ্চুর ডাকে দীপক বাবু সম্বিত ফিরে পেলেন ।
- স্যার , লাশটার গা থেকে এই জিনিস গুলো পাওয়া গেছে ।
দীপক বাবু দেখলেন একটা ট্রান্সপারেন্ট পলিথিন ব্যাগে এক জোড়া কানের দুল ,একটা সরু হোয়াইট গোল্ডের চেইন আর একটা ভাঁজ করা কাগজ কনস্টেবল বাচ্চু টেবিলের উপর রাখলেন ।
দীপক বাবুর কপালে ভাঁজ পড়লো । তিনি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন , “ কাগজটা আবার কোত্থেকে এলো ?”
- স্যার , মেয়েটার হাতে শক্ত করে এই কাগজটা ধরা ছিল । মনে হয় লাফ দেবার আগে থেকেই হাতে ছিল ।
দীপক বাবুর চোখের সামনে ছাদ থেকে আছড়ে পড়া মেয়েটার বীভৎস লাশের ছবিটা ভেসে উঠলো । কেন জানিনা আজ শুধু মেয়েটার মুখের জায়গায় তিনি নিজের মেয়ের মুখ দেখতে পেলেন ।
দীপক বাবুর এই কেসটা নিয়ে কাজ করতেই মন চাইছে না । তিনি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার কাজে মন দিতে চাইলেন । ড্রয়ার থেকে গ্লাভসটা বের করে হাতে পরে নিলেন ,চিঠিটা থেকে হয়তো কোন সূত্র পাওয়া যেতে পারে কি কারণে এমন কচি মেয়েটা পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার সিদ্ধান্ত নিলো ।
দীপক বাবু গ্লাভস হাতে কাগজটা তুলে নিয়ে ভাঁজ খুললেন ।গোটাগোটা হাতে লেখা একটা চিঠি, যার সম্বোধন , মা !
চমকে উঠলেন দীপক বাবু,মেয়েটা মৃত্যুর আগে তার মায়ের কাছে চিঠি লিখে গেছে। কি এমন কথা থাকতে পারে যেটা সে বেঁচে থাকতে মুখ ফুটে তার মাকে বলতে পারেনি !
দীপক বাবু চিন্তিত মুখে চিঠি পড়া শুরু করলেন ।

মা! মা! আমার প্রিয় মা!
কেন জানিনা তোমাকে অনেক অনেক বেশি করে আজ ডাকতে ইচ্ছা করছে । জানিনা, মনে হচ্ছে হয়তো আর কখনো ডাকতে পারবো না ,অথবা ডাকলেও তুমি শুনবে না তাই ।
আমি খুব খারাপ,খুব বাজে । তাই না মা ? আমি জানি, আমি তোমাকে খুব কষ্ট দেই । অন্যরা যখন গর্ব করে তাদের মেয়ের কথা বলে ,তুমি চুপ করে শোন আর কষ্ট পাও ।আমি সব জানি ,আমি সব বুঝি ।কিন্তু কি করবো বল ,আমি যে এমনই ।
তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ তাই না মা?কষ্ট পেও না মা ।আমি কষ্ট পেলে যেমন তুমি স্থির থাকতে পারো না ,তেমনি তোমার কষ্টেও আমি মরে যাই ।শুধু বোঝাতে পারি না ,বলতে পারি না যে আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি ।
আমি সব জেনে বুঝেও তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
কি করবো বল ? আমি যে আর পারছিলাম না ।
মা তোমার মনে আছে ,আমি যখন নিজে নিজে হাঁটতে শিখেছি তখন একটুখানি চোখের আড়াল হলে তুমি কেমন পাগল হয়ে যেতে ? আমি খুব ছোটো ছিলাম ,তবু আবছাভাবে মনে পরে ।
আমি প্রথম যেদিন হাঁটতে শুরু করেছি তার গল্প শুনে শুনে বিরক্ত সবাই।কিন্তু তুমি নানা রঙ চড়িয়ে এমনভাবে গল্পটা করতে যেন তোমার মেয়ে হাঁটতে শেখেনি বরং তার পায়ের আঘাতে পৃথিবীর দর্প চূর্ণ করেছে ।
মা ,ছেলেবেলা থেকেই তোমার মেয়েটা দস্যি।সমাজের নিয়ম-কানুনগুলো আমাকে আষ্ঠে-পৃষ্ঠে বাঁধতে চেয়েছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি ছুটবার ,ওগুলো আমাকে আরো বেশি করে জড়িয়ে ধরেছে । আমি চেঁচিয়ে বলেছি মা আমাকে বাঁচাও ।
মা ,তুমি তো জানো আমি ছুটতে ভালোবাসি ।তারপরও আমার হাতে-পায়ে কেন নিয়মের বেড়ি পড়িয়ে দিলে । আমাকে বললে ,আমার আর ছেলেদের সাথে খেলা চলবে না ,দৌড়নো চলবে না ।
আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম আমার চলা , বলা ,খেলা সবকিছুতে নিয়মের বন্ধন । আমি কিছু বুঝতাম না ,আমি রেগে যেতাম । তুমি বলতে, “মেয়েদের অতো রাগ ভালো না ।“
আমি আরও বুঝতাম না ।আরও রেগে যেতাম ।
কেন মা ? রাগ যদি খারাপ হয় ছেলে ,মেয়ে সবার জন্যই খারাপ ।শুধুমাত্র মেয়েদের জন্য খারাপ কেন হবে ?
আমি বুঝতে পারতাম না ,পারি না , কখনো পারবোও না ।
আমার দস্যিপনা ,আর মারামারি স্বভাবের জন্য আমাকে গার্লস স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলে । তারপরও চিন্তায় থাকতে রাস্তায় কারো সাথে ঝামেলা করি কিনা ! আমি ধীরেধীরে আরো একটু বড়ো হলাম ,কিন্তু মনে মনে অনেক ছোটো হয়ে গেলাম । সবার কতো বুদ্ধি আর আমি একটা বোকার হদ্দ ! আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলাম । বিশ্বাস করো মা , আমি খুব করে চেয়েছি তোমার ভালো মেয়ে হতে ।
মা তোমার মনে আছে ,বাসের ঐ নোংরা লোকটার কথা যখন তোমাকে বলেছিলাম তুমি আমাকে বললে আর কখনো বাসে না উঠতে ।উঠলেও মহিলা সিটে বসতে বললে ।আবার রাস্তায় চলবার সময় মাথা নিচু করে কোন দিকে না তাকিয়ে হাঁটতে বললে ।রাস্তায় বখাটে ছেলেগুলোর কথা বললে ঐ পথ দিয়ে যেতে বারণ করলে ।আমি কতো পথ বদলাবো মা ? পথ বদলাতে বদলাতে আমার পৃথিবীটা যে ছোট হয়ে যাচ্ছে তুমি কবে বুঝবে মা ?
কিন্তু আমি তবুও পথ বদলেছি - যেন সব দোষ আমার ,সব অন্যায় আমার ।
না অন্যায় নয় ,পাপ ।আসলেই সব পাপ আমার । সব কিছুতেই দোষ না করেও আমি দোষী ।
আমি তোমার কাছে মুক্তি চেয়েছিলাম ।কিন্তু তুমি আমার হাতে-পায়ে অদৃশ্য শিকল পরালে ,চোখে বেঁধে দিলে কালো কাপড় ,কানে গুজে দিলে তুলো ।তবু আমি শিকল পরা পায়েই হাঁটতে চাইলাম ,কালো কাপড়ের ফোকর দিয়ে আলো আমার চোখে এসে পড়লো , তোমার গুজে দেওয়া তুলো শব্দ তোরঙ্গ কে রুখতে পারছিলো না ।আমি আরো বেশি করে মুক্তি চাইলাম ,আমার অভিমান হল ভীষণ তোমার উপর ।
একদিন হঠাৎ অবাক হয়ে দেখলাম আমার পরম নির্ভরতার স্থান যেখানে ,যার কাছে আমি মুক্তি চাইছি সে নিজেই তো বন্দি ।
আমাদের এই সমাজ মেয়েদের হয় দেবীর আসনে স্থান দেয় নয়তো দাসীর । দেবীতো হাতে গোনা কয়জন হয় ,বাকীরা সবাই দাসী ।
আমি দেবী নই ,আমি দাসী হতে চাইনি - আমি চেয়েছিলাম মানুষ হতে ।
সৃষ্টিকর্তা আমাদের মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেন কিন্তু আমরা পৃথিবীতে আসার পর নানা জাত ,ধর্ম ,বর্ণ , গোত্রে বিভক্ত হয়ে যাই । তেমনি মেয়েরা জন্ম নেয় মানুষ হয়ে কিন্তু জন্মের পর তার স্বগোত্রের সদস্যরা শেখাতে থাকে কিভাবে মেয়ে হয়ে বাঁচতে হবে আর যখন বাইরে পা রাখে তখন সারা পৃথিবী তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয় ,”তুমি শুধুমাত্র একটা মেয়ে ।“
তোমরা সবাই আমাকে শেখাতে চেয়েছ কিভাবে মেয়ে হয়ে থাকতে হয় ,মনে করিয়ে দিয়েছ আমি যে একটা মেয়ে ।আমাকে রক্ষা করতে চেয়েছ কিন্তু আমার মধ্যে এমন কোন বোধ জাগ্রত হতে দিতে চাওনি যে আমি নিজেই নিজেকে রক্ষা করতে পারি । তোমরা আমাকে সব দিয়েছ শুধু স্বাধীনতা দাওনি । "স্বাধীনতা হলো নিজের মতন স্বপ্ন দেখার অধিকার" - সেই অধিকার থেকে আমাদের বঞ্চিত করেছো এক স্ত্রী লিঙ্গ নির্মাণ করে। আমাকে হাজারো নিয়মে বাঁধতে চেয়েছ । তাই আমি আজকে সব নিয়মের শিকল ছিঁড়লাম এই পরাধীন জীবনের। আমাকে তুমি ক্ষমা কোরো আমার অবাধ্যতার জন্য।

দীপক বাবু চিঠিটা শেষ করে বাড়ি যাবার জন্য উঠে দাঁড়ালেন । আজকে ওনার নাইট শিফট ছিল ,কিন্তু এখন তাকে বাড়ি যেতেই হবে । বাড়ি পৌঁছে ওনার 
আত্মজাকে বলতে হবে ,” মা ,তোর মাথা নিচু করে হাঁটবার কোন দরকার নেই। তুই চুপ করে থাকবি কেন ? তুই মাথা উঁচু করে বাঁচবি ,সমাজের ওইসব কিটদের চুপ করিয়ে দিবি । আমি জানি তুই পারবি । আমি আছি তোর পাশে ,সবসময় ।“ কারণ ওনার জীবনের রাজকন্যার সকল সুখ আনার দায়িত্ব তো ওনার, তাই ওর জীবনে স্বাধীনতার স্বাদও উনিই আনবেন।
আজ কেন জানিনা দীপক বাবুর নিজেকে ভীষণ হালকা লাগছে, ওনার ভিতরের যুদ্ধ শেষে উনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন - ঝড় এলে পালিয়ে বাঁচার কোন উপায় নেই ।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

একলা চলার মহিমা।

ডায়েরির পাতায় আপনার চিন্তা প্রকাশের কৌশল।

পুরোনো বইয়ের দোকান।