মা তুঝে সালাম!
শরতের সকাল, চারিদিকটা সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। সব মিলিয়ে একটা পুজো পুজো গন্ধ। সকলের মনে মা আসবার কারণে একটা খুশীর উৎসব খেলা করে চলেছে। আর্ট কলেজের ফাইন আর্টসের পোস্ট গ্রাজুয়েট ক্লাসের ছেলেগুলোর বহু আকাঙ্ক্ষিত দিনটি আজ। এতগুলো বছর এই দিনটির অপেক্ষায় রয়েছে যে কটি লড়াকু শিল্পী মানুষ, তারা আজ সকালের অমানুষিক ভিড় ঠেলে ট্রেনে বাসে করে এসেছে কলেজে। আজ Master of Fine Arts -র এই ক্লাস টাতে একটা চাপা উত্তেজনা। বিকিউব (মানে বিধু বিনোদ বসুর) - র এই ক্লাস কেউ মিস করতে চায় না। অজানাকে জানবে বলে আজ ক্লাসের পাঁচজনকেই ভীষণ উত্তেজিত লাগছে। বিকিউব কিন্তু সকলকে~ লক্ষ্য করছেন অথচ ভাবখানা দেখাচ্ছেন যেন কিচ্ছু দেখছেন না। অয়ন আস্তে করে সৌমিত্রকে বলল, "আজ শালা বাসে একটা মালের সাথে হেব্বি কিচাইন হয়েছে। মনটা ভালো লাগছে না।"
এরমধ্যেই বিধু বাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন "এসো মা"। তারপর সকলের দৃষ্টি সেই মায়ের দিকে হতেই অয়ন যেন কারেন্ট খাবার মতো লাফিয়ে সৌমিত্রকে চিমটি কেটে বলল, "আরে সেই মালটা সমু !" মহিলা বিধু বাবুকে প্রণাম করে বলল," আসছি আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে।" ঘরের মধ্যে তখন উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে।
মহিলাটি এসে দাঁড়াতেই বিধু বাবু সবাই কে বললেন,--"আজ দেখি কে কত বেশি 'ফেমিনিস্ট'।
এই আঁকার আগে বলে নেওয়া দরকার যে, সকলেই নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষের কথা মনে করে এই ছবিটা আঁকবে।"
মহিলার বয়স এই ত্রিশের কাছে অথচ মুখখানা সেই আঠারোর মতোই, শরীরে মেদ নেই, গায়ের রং কালো, নিটোল মুখ খানি, ঠোঁটের রঙ এখন আর নেই, দুহাতের শাঁখা পলাটাও নেই, মাথার সিঁথি ফাঁকা, পাতলা ফিনফিনে সাদা ধূতিখানি জড়িয়ে এসেছিলেন। বিধুবাবু তাকে একটি আলো আঁধারিতে বসিয়ে এক ভাগ খোলা চুলকে খোলা বক্ষ বিভাজিকার উপর ছড়িয়ে দিলেন আর গায়ের কাপড় খানি খুলে দিলেন.........
যে সোমেন কলেজ পালিয়ে নুন শো দেখতে গেলে খান দশেক সিটি মেরে নেয় নায়িকার আগমনেই, সেই সোমেনের এই আশ্বিনের শিরশিরে আবহাওয়ায় গলদঘর্ম অবস্থা।
সামনের বেঞ্চে বসা বিপাশার আজ কান দিয়ে আগুন বের হচ্ছে, ডেনিম সার্টের বুকের বোতামটা খুলে
দিয়েছে কখন নিজের অজান্তেই। আজ কেউ যদি ওর
দেহের গঠন নিয়ে খ্যাপায়, তবে তাকে জোর করে ঐ শূন্য বুকেই চেপে ধরবে সে------
ওদিকের লাস্ট বেঞ্চে চুপচাপ বসা অনামিকার , মনে পড়ে যাচ্ছে তার দাদুর ছোঁয়া (গোপন অঙ্গে) দিন গুলোর কথা! উফফ্ কি অসহ্য লাগছে তার....
এদিকে বিকিউব পিছন থেকে বলেই চলেছেন," আজ তোমাদের আসল পরীক্ষা, মনে করো তোমাদের সামনে তোমাদের মা, বোন, প্রেমিকা, ধর্ষিতা, কিম্বা কোন প্রতারক নারী কে দেখছো তোমরা। ফুটিয়ে তোল নিজেদের পরিচিত নারীর ছবি নিজের নিজের ক্যানভাসে........."
ক্লাসের সবচেয়ে নটোরিয়াস ছাত্র প্রতাপ মানে প্রতাপাদিত্য আজ সবচেয়ে শান্ত, ক্যানভাসে মন দিয়ে ছবি আঁকছে সে।এমন কোন দিন নেই যেদিন, সে বিকিউবের কাছে গাল মন্দ খায় না, আজ স্যারও অবাক তাই।
অয়ন , সৌমিত্র, সোমেন সবাই যার যার নিজের
মতন করে মডেলকে রূপ দিচ্ছে। অয়ন তার
কল্পনার প্রেমিকাকে, সৌমিত্র তার মা কে, সোমেন তার বিশ্বাসঘাতক প্রেমিকা কে, বিপাশা কেমন যেন সাঁওতালি মেয়ের ধাঁচে নিজের শরীরকে বেঁধে নিয়েছে, আর অনামিকার ক্যানভাসে ধরা পড়েছে মা চন্ডীর রণং দেহি মূর্তি। ঘুরে ঘুরে সবার ক্যানভাস দেখার পর বিকিউব যখন প্রতাপাদিত্যের ক্যানভাসের কাছে গেলেন, তখন তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, তার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে স্নেহময়ী, মমতাময়ী, লাস্যময়ী অবিকল সম্মুখের নারীর প্রতিভূ। খানিকটা অবাক হয়েই তিনি প্রতাপকে বললেন, "তোমার যে এতো ভালো আঁকার হাত, তা আগে কোনদিন জানতে দাও নি তো! আজ কি হলো তোমার! এমন স্কেচের সঙ্গে এতো সুন্দর রঙের মিশেল অভাবনীয় প্রতাপ । মনে হচ্ছে যেন সাক্ষাৎ মা এসে বসে আছেন। কি করে পারলে তুমি এটা করতে!"
প্রতাপ মাথা নীচু করে আছে দেখে স্যার মুখটা উপরে টেনে ধরতেই প্রতাপ স্যারকে জড়িয়ে ধরে বললো," ও যে আমার দিদি স্যার ।" স্যার যেন কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। শুধু মেয়েটি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে যখন স্যারকে আসি বলে বেরিয়ে গেল তখন প্রতাপ বলে উঠলো," একা যাস না দিদি, আজ আমি যাবো তোর সঙ্গে।"
স্যার বললেন," ও কি বিবাহিত প্রতাপ ?"
প্রতাপ বললো , "বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এটুকু অভিনয় তো করতেই হয় স্যর।"
পিছনের ক্লাবে ঠিক তখনই বেজে উঠছে রূপং দেহী/ জয়ং দেহী/যশঃ দেহী/দ্বিষো জহি -মহালয়ার আগের দিন যে ....... মনে ছিল না কারোর। প্রতাপ আর মেয়েটির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকা বিধু বাবুর চোখের সামনে ভেসে উঠলো -
"আন্দোলনে উগ্রপন্থে, শিক্ষাব্রতে কর্মযজ্ঞে রান্নাঘরে, আঁতুড় ঘরে।
মা তুঝে সালাম !
অগ্নিপথে, যুদ্ধজয়ে, লিঙ্গসাম্যে, শ্রেণিসাম্যে দাঙ্গাক্ষেত্রে, কুরুক্ষেত্রে।
মা তুঝে সালাম!"
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন