একদিনের নীরবতা
(একটি অযান্ত্রিক দিনের আত্মকথা)
সকাল ৭টা।
অ্যালার্ম বাজে না।
অরিন্দমের চোখ খুলে যায় স্বাভাবিক সূর্যালোকে। জানালার পর্দা ফাঁকা ছিল রাতভর, তাই রোদ এসে সরাসরি গালে পড়েছে। সে একটু চমকে ওঠে, ফোনের স্ক্রিনের দিকে হাত বাড়ায়—
…কিন্তু আজ ফোন নেই পাশে।
নেই বলাটা ঠিক হবে না। আছে—ঘরের ড্রয়ারে লুকনো।
গতকাল রাতে সে নিজেই সেটাকে বন্ধ করে রেখে দিয়েছিল, সিদ্ধান্ত নিয়ে—
"আগামীকাল, একটুও নয়। একটাও স্ক্রল, একটাও ক্লিক, একটাও টোন নয়। শুধু আমি আর আমার দিন।"
প্রথম আধঘণ্টা ভয়ংকর।
চোখ বারে বারে ফোন খোঁজে, হাতের তালু অস্বস্তিতে ঘামে, মনে হয় কিছু একটা ভুলে গেছে।
সে চুপ করে জানালার পাশে দাঁড়ায়।
বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা লালে লাল। কবে ফুল ফুটেছে, সে খেয়ালই করেনি।
পড়শির ছোট ছেলেটা সাইকেল চালানো শিখছে, বাবার হাত ধরে।
অরিন্দম মন দিয়ে দেখে।
এই প্রথম, অনেকদিন পর—"মন দিয়ে" দেখা।
চায়ের টেবিলে মা অপেক্ষা করছিলেন।
“আজ তো তুই অনেক সকালে উঠেছিস,”
মা একটু অবাক, একটু খুশিও।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে অরিন্দম বলল,
“মা, আজকে আমার ফোন বন্ধ। একদিন শুধু তোমাদের সঙ্গে থাকতে চাই।”
মায়ের চোখে একরাশ অবিশ্বাস আর আনন্দ একসাথে জ্বলে উঠল।
“পাগল কোথাকার... তা ভালোই করেছিস,”
বলেই মা এক কাপ চা ওর সামনে বাড়িয়ে দিলেন।
কথোপকথন চলতে লাগল—নির্বিচারে, নির্ভুলে।
কোনো পপ-আপ নোটিফিকেশন আসেনি, কোনো ইনস্টাগ্রামের রিল মাঝপথে থামিয়ে দেয়নি সেই মুহূর্তটুকু।
দুপুরে রান্নার গন্ধে ঘর ভরে ওঠে।
আজ মা তার প্রিয় খিচুড়ি করেছে, সঙ্গে বেগুন ভাজা।
খাবার টেবিলে বাবাও বসেছেন, তিনজন একসাথে। অরিন্দম যেন ছোটবেলার সেই রবিবারের দুপুর ফিরে পেয়েছে—টিভি বন্ধ, কারও হাতে ফোন নেই, শুধু গল্প আর গল্প।
বিকেলে হাঁটতে বেরোল পাড়ার রাস্তায়।
পুরনো লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ে। গন্ধটা এখনও একই রকম—পুরোনো বইয়ের আর ধুলোর মিশ্র ঘ্রাণ।
লাইব্রেরিয়ান জেঠু চমকে ওঠেন,
“তুই যে এখনো বই পড়িস ভাবতেই পারিনি!”
অরিন্দম হেসে বলে,
“আমিও ভাবিনি, আজ সময় থাকবে।”
রাত সাড়ে আটটা।
ডিনার শেষে আবার বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নেয়। চালু করে।
১০৩টা মেসেজ, ৯টা মিসড কল, ১৮টা গ্রুপ নোটিফিকেশন, ২টা আপডেট রিকোয়েস্ট।
সে শুধু স্ক্রিনটা দেখে। পড়েও না।
সে জানে, আজকের দিনটায় কিছুই হারায়নি সে। বরং অনেক কিছু ফিরে পেয়েছে—
নিজেকে, মা-বাবার মুখের হাসি, রোদে-ঢেকে-যাওয়া কৃষ্ণচূড়া, পাড়ার লাইব্রেরির গন্ধ—
আর একটা অমূল্য সত্য: "মোবাইল ফোন আমাদের সময় নেয় না, আমরা তাকে দিয়ে দিই।
কিন্তু সময়—সে শুধু একবারই আসে।
তাকে ধরা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়—যখন সে পাশেই থাকে, নীরব হয়ে।"
📌 বার্তা:
একটা দিন যদি আমরা ফোন ছাড়তে পারি, আমরা বুঝতে পারি—আমাদের চারপাশের মানুষ আর মুহূর্তগুলো কতটা মূল্যবান।
টেকনোলজি আমাদের পরিপূরক, কিন্তু আমাদের প্রতিস্থাপক নয়।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন